১৪ বছর পর আকাশপথে সরাসরি সংযোগ, ঢাকা–করাচি ফ্লাইটে নতুন দিগন্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
১৪ বছর পর আকাশপথে সরাসরি সংযোগ, ঢাকা–করাচি ফ্লাইটে নতুন দিগন্ত

প্রকাশ: ২৮  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আবারও আকাশপথে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে ঢাকা ও করাচি। প্রায় ১৪ বছর পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে নন-স্টপ ফ্লাইট চালু করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হবে, যা দুই দেশের যাত্রী, ব্যবসায়ী ও পর্যটন খাতের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে দুই দিন—বৃহস্পতিবার ও শনিবার—ঢাকা–করাচি রুটে সরাসরি ফ্লাইট চলবে। ট্রানজিট ছাড়াই নন-স্টপ এই ফ্লাইট চালু হওয়ায় যাত্রীরা যেমন সময় সাশ্রয় করতে পারবেন, তেমনি ভ্রমণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাউন্ড ট্রিপে যাত্রীদের সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে, যা আগের তুলনায় বড় স্বস্তির খবর।

এর আগে ঢাকা থেকে করাচি যেতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ট্রানজিট হাব ব্যবহার করতে হতো। এতে যাত্রার সময় অনেক বেড়ে যেত এবং অতিরিক্ত খরচও গুনতে হতো যাত্রীদের। কখনো কখনো ট্রানজিটের কারণে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যেত, যা বিশেষ করে বয়স্ক যাত্রী, রোগী কিংবা ব্যবসায়ীদের জন্য ছিল ভোগান্তির। নতুন এই সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ায় সেই জটিলতা অনেকটাই দূর হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঢাকা থেকে করাচি পর্যন্ত ১ হাজার ৪৭১ মাইল পথ পাড়ি দিতে ব্যবহার করা হবে ১৬২ আসনের বোয়িং ৭৩৭ মডেলের উড়োজাহাজ। এই রুটে যাত্রা সম্পন্ন হতে সময় লাগবে প্রায় তিন ঘণ্টা, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। স্বল্প সময়ের এই ভ্রমণ যাত্রীদের কাছে আরও আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম বলেন, সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রতি যাত্রীদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। তিনি জানান, প্রথম ফ্লাইটের সব টিকিট ইতোমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে এবং দ্বিতীয় ফ্লাইটেরও ৮০ শতাংশের বেশি আসন বুকড। তার ভাষায়, “ট্রানজিট ছাড়াই সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ায় যাত্রা হবে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ, দ্রুত এবং ঝামেলামুক্ত। যাত্রীদের সাড়া আমাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।”

দীর্ঘদিন পর পাকিস্তানে সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ায় উচ্ছ্বসিত যাত্রীরাও। অনেকের মতে, এই রুট চালু হওয়া শুধু ভ্রমণ সহজ করবে না, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও বোঝাপড়া বাড়াতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা করছেন। পাকিস্তানে পড়াশোনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কিংবা সেখানে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের জন্যও এটি একটি বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং দ্য বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, ঢাকা–করাচি রুট চালু হওয়া কেবল যাত্রী পরিবহনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার মতে, “এই রুট চালু হলে কার্গো পরিবহনেও বড় সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।” তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আকাশপথের সংযোগ বাড়লে আঞ্চলিক সহযোগিতাও নতুন গতি পাবে।

বাণিজ্য বিশ্লেষকরাও একই ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। তাদের মতে, করাচি পাকিস্তানের একটি প্রধান বাণিজ্যিক ও শিল্পনগরী। সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের জন্য পণ্য পরিবহন সহজ হবে। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয় এমন পণ্য, তৈরি পোশাকের নমুনা কিংবা জরুরি কার্গো পাঠাতে এই রুট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

উল্লেখ্য, নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০১২ সালে ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দুই শহরের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট আর চালু হয়নি। ফলে যাত্রীদের ট্রানজিটের ওপর নির্ভর করেই যাতায়াত করতে হতো। নতুন করে এই রুট চালু হওয়াকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশ বিমান সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই রুটে রাউন্ড ট্রিপে যাত্রীরা সর্বনিম্ন ৫১ হাজার টাকায় যাতায়াত করতে পারবেন। এটি আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত কম। এই মূল্যছাড় সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের জন্যও বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। করাচির পাশাপাশি পাকিস্তানের অন্যান্য শহর ও পর্যটন স্পট ভ্রমণের ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে সরাসরি সংযোগ একটি বড় সুবিধা এনে দেবে। একইভাবে পাকিস্তান থেকেও বাংলাদেশে পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের আসা বাড়তে পারে, যা দেশের হোটেল, পরিবহন ও সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, ১৪ বছর পর ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়া শুধু একটি নতুন এভিয়েশন রুটের সূচনা নয়, বরং এটি দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। যাত্রীদের স্বস্তি, ব্যবসার গতি এবং আঞ্চলিক সংযোগ—সব দিক বিবেচনায় এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে এই রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা আরও বাড়ানো হয় কিনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত