কুলাউড়ায় সেতুর নিচে বেপরোয়া বালু উত্তোলন, জরিমানা ২ লাখ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
কুলাউড়ায় সেতুর নিচে বেপরোয়া বালু উত্তোলন, জরিমানা ২ লাখ

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় নবনির্মিত গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নিচ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। রাজাপুর সেতুর নিচে মনু নদী থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু তোলার দায়ে বালুমহালের ইজারাদারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেছে। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর সেতু সংলগ্ন এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে সেতু ও আশপাশের অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছিল।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন কুলাউড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুল ইসলাম। অভিযানের সময় বালুমহালের ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপির পক্ষে উপস্থিত থাকা তার ম্যানেজার সাকিবকে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী দুই লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন—জরিমানার পরও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে সেতু রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

অভিযানে কুলাউড়া থানা পুলিশের সদস্যরা নিরাপত্তা ও সহায়তার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় পৃথিমপাশা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সেলিম আহমদ চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি অভিযানকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে এবং এলাকাবাসীর মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়া-পৃথিমপাশা-হাজীপুর-শরীফপুর সড়কের মনু নদীর ওপর প্রায় ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন রাজাপুর সেতু এবং হাজীপুর-টিলাগাঁও ইউনিয়নের সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীন ব্রাহ্মণবাজার-শমসেরনগর সড়কের মনু নদীর ওপর নির্মিত কটারকোনা সেতুর আশপাশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সেতুর পিলার ও সংযোগ সড়ক দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন প্রকৌশলী ও স্থানীয়রা।

নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ট্রাক ও ড্রেজারের শব্দে এলাকা কেঁপে ওঠে। নদীর তলদেশ গভীর হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু দুটির স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

জানা গেছে, বালুমহালের ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপি এবং তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন দীপক দে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক শক্তির কারণে বারবার জরিমানা হলেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। গত চার মাসে উপজেলা প্রশাসন কয়েক দফায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ছয় লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশাসনের কঠোরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেতুর নিচে বালু তোলার ফলে নদীর দুই পাড়েই ভাঙন শুরু হয়েছে। কৃষিজমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, উন্নয়নের নামে যে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, সেটিই যদি অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ক্ষতি অপূরণীয় হবে।

এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তিনি জানান, এর আগেও একাধিকবার বালুমহালের ইজারাদারের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নিয়ম না মেনে আবারও বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ায় এবার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি একই ধরনের অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হয়, তাহলে আরও কঠোর দণ্ড আরোপ করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

অভিযানের সময় অবৈধভাবে স্থাপন করা বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম ও স্থাপনাগুলো নির্ধারিত স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেতু ও নদীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হবে। প্রয়োজনে ইজারা বাতিলসহ আইনানুগ সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, এটি দেশের নদী ও অবকাঠামোর জন্য বড় হুমকি। সেতুর পিলারের কাছ থেকে বালু তোলা হলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই জরিমানার পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে প্রশাসনকে।

কুলাউড়ার রাজাপুর ও কটারকোনা সেতু শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থী ও রোগীদের যাতায়াত—সবকিছুই এই সেতুগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে পুরো এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সব মিলিয়ে, কুলাউড়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযানে দুই লাখ টাকা জরিমানা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেও স্থানীয়দের প্রত্যাশা এখানেই শেষ নয়। তারা চান, নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হোক। নইলে জরিমানার অঙ্ক বাড়লেও নদী ও সেতুর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না—এমনটাই মনে করছেন এলাকাবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত