প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল ভূরাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল সৌদি আরব। ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে রিয়াদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না—এ কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে এক ফোনালাপে এই আশ্বাস দেন তিনি। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ মঙ্গলবার এ তথ্য জানায়। এমন এক সময়ে এই অবস্থান এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে জোরদার হচ্ছে এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা বাড়ছে।
ফোনালাপে সৌদি যুবরাজ বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংলাপ এবং কূটনীতির বিকল্প নেই। মতপার্থক্য থাকলেও তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত—এই নীতিতেই সৌদি আরব বিশ্বাসী। তাঁর এই বক্তব্য কেবল ইরানকেই নয়, পুরো অঞ্চলকে একটি বার্তা দেয় যে রিয়াদ এই মুহূর্তে সংঘাত নয়, বরং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে থাকতে চায়।
ইরানের পক্ষ থেকেও আলোচনার প্রতি আগ্রহের কথা তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে যুদ্ধ এড়ানোর যেকোনো উদ্যোগকে তেহরান স্বাগত জানায়। এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, সরাসরি সংঘাতের পথে না গিয়ে ইরানও কূটনৈতিক পথ খোলা রাখতে চায়, যদিও বাস্তব পরিস্থিতি এখনও জটিল ও অনিশ্চিত।
সৌদি আরবের এই ঘোষণার আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে। আবুধাবি স্পষ্ট করে বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে তারা তাদের আকাশসীমা বা আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। উপসাগরীয় দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশের এই সমন্বিত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত মানচিত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে বোঝা যায়, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো সরাসরি কোনো সংঘাতের অংশ হতে চাইছে না এবং নিজেদের ভূখণ্ডকে যুদ্ধের মঞ্চে পরিণত করার ঝুঁকি এড়াতে সচেষ্ট।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতাও আলোচনায় এসেছে। গত সোমবার দুই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও সহায়ক যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে পৌঁছেছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা বেড়েছে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে এই উপস্থিতি ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কাও বাড়িয়েছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইরানের দিকে একটি ‘নৌবহর’ এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করলেও, সেটি ব্যবহার করতে হবে না বলেই তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক শক্তি প্রদর্শন একদিকে প্রতিরোধমূলক বার্তা, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনায় চাপ তৈরির কৌশল। তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার ঘোষণা এই কৌশলকে কিছুটা জটিল করে তুলতে পারে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো বড় সামরিক অভিযানে আঞ্চলিক সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দেশটিতে বেশ কিছুদিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এসব বিক্ষোভ দমনে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে পথচারীরাও ছিলেন। সংগঠনগুলোর মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর শিয়া ধর্মীয় নেতাদের ক্ষমতায় আসার পর থেকে এটি সবচেয়ে বড় দমন-পীড়নের ঘটনা। এই অভিযোগগুলো ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অস্থিরতা ও প্রাণহানির জন্য বিদেশে অবস্থানরত বিরোধী গোষ্ঠীর সমর্থনপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজরা’ দায়ী। ইরানের দাবি, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় তারা কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। এই দুই বিপরীত বর্ণনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মানবাধিকার ও নিরাপত্তা—দুই দিকের ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এই বাস্তবতায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বক্তব্যকে অনেকেই একটি কৌশলগত ভারসাম্য হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘ বৈরিতার পর কিছুটা স্থিতিশীলতার পথে এসেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন, আঞ্চলিক আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং সরাসরি সংঘাত এড়ানোর প্রবণতা—সব মিলিয়ে রিয়াদ এখন নিজেকে একটি দায়িত্বশীল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় কোনো সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। শরণার্থী সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে অঞ্চলটির জন্য তা হবে ভয়াবহ। সে কারণেই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর ‘আকাশসীমা ব্যবহার নয়’ অবস্থান অনেকের কাছে আশার বার্তা হিসেবে ধরা দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রশ্নে সৌদি আরবের এই স্পষ্ট অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। এটি একদিকে যুদ্ধ এড়ানোর বার্তা, অন্যদিকে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান। সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা কোন পথে এগোয়, সেটিই নির্ধারণ করবে এই উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত সংঘাতে রূপ নেয়, নাকি আলোচনার টেবিলেই সমাধান খুঁজে পায়।