প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনে নির্বাচনী উত্তাপের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি সহিংসতার অভিযোগ। জামায়াতে ইসলামীর এক ওয়ার্ড সভাপতিকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিএনপি প্রার্থী হারুনুর রশীদের ছেলে রুবাইয়াত ইবনে হারুন রাফিকে তলব করেছে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। অভিযোগটি নির্বাচনকালীন আচরণবিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতি ও প্রশাসনিক অঙ্গনে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩-এর চেয়ারম্যান ও সিভিল জজ মো. মেহেদী হাসান এ সংক্রান্ত তলব আদেশ জারি করেন। আদেশে বলা হয়েছে, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে বেআইনি কার্যক্রমের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অভিযুক্তকে কারণ দর্শাতে হবে। কেন তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে না—সে বিষয়ে আগামী বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির আদেশে উল্লেখ করা হয়, কমিটির কাছে মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্বাচনী পরিবেশকে বিঘ্নিত করে এমন আচরণ সংঘটিত হয়েছে, যা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এবং নির্বাচনী আচরণবিধি ২০২৫-এর একাধিক ধারা লঙ্ঘনের শামিল। এ কারণে কমিটি মনে করে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা প্রয়োজন হতে পারে।
আদেশে আরও বলা হয়, এই ঘটনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) শোকজ নোটিশ জারি করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটির মতে, ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; বরং নির্বাচনের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করার মতো একটি গুরুতর বিষয়, যা প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নামোশংকরবাটি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ওই সময় বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হারুনুর রশীদ ও তাঁর স্ত্রী সৈয়দা আশিফা আশরাফী পাপিয়ার উপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর ওয়ার্ড সভাপতি আজিজুল হক নূরের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, হারুনুর রশীদের ছেলে রুবাইয়াত ইবনে হারুন রাফি আজিজুল হক নূরের কলার ধরে তাকে মারধর করেন এবং শূন্যে তুলে ধরে লাঞ্ছিত করেন।
এই অভিযোগ সামনে আসার পরপরই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করে, এটি একটি পরিকল্পিত হামলা এবং হত্যাচেষ্টার শামিল। তাদের দাবি, প্রচার মিছিলের সময় গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটার অজুহাত দেখিয়ে হামলাটি চালানো হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে ওই দিন রাতেই জেলা শহরের নতুনহাট মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল করে জামায়াতে ইসলামী। মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ জানান, ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়। নির্বাচনের আগে এমন সহিংস ঘটনার খবরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, নির্বাচনী সহিংসতা বাড়লে ভোটের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতারা এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেননি। তবে দলীয় সূত্র বলছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনো মন্তব্য করা হবে না। অভিযুক্ত রুবাইয়াত ইবনে হারুন রাফির পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির আইনগত পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নির্বাচনকালীন সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নের মুখে পড়ে। কমিটির তলব আদেশ সেই দিক থেকে একটি নজির স্থাপন করতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বারবার বলা হচ্ছে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করা হবে। কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক যদি নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করে, তবে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ঘটনা সেই ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগের একটি পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের সময়ে সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। সহিংসতা ও লাঞ্ছনার অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তিক্ত করে তোলে না, বরং সাধারণ মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করবে।
আগামী ২৯ জানুয়ারি অভিযুক্তের লিখিত ব্যাখ্যা এবং পুলিশ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। ওই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে শাস্তিমূলক সুপারিশ হিসেবে যাবে কি না। সব মিলিয়ে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের এই ঘটনা নির্বাচনকালীন শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন রক্ষার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।