শুল্ক কমলেও মুঠোফোনের দাম কি সত্যিই কমবে?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
শুল্ক কমলেও মুঠোফোনের দাম কি সত্যিই কমবে?

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের মুঠোফোন বাজারে নতুন বছরের শুরুটা স্বস্তির বদলে যেন প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তার বার্তা নিয়েই এসেছে। একদিকে সরকার আমদানি ও সংযোজন পর্যায়ে শুল্ক কমিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য মুঠোফোন আরও সহজলভ্য করার আশ্বাস দিয়েছে, অন্যদিকে বছরের শুরুতেই ব্যবসায়ীরা একযোগে প্রায় সব ব্র্যান্ডের ফোনের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভোক্তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে—শুল্ক কমলেও মুঠোফোনের দাম কি আদৌ কমবে, নাকি এটি কেবল কাগুজে হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতেই দেশের বাজারে বিভিন্ন কোম্পানি ও মডেলভেদে মুঠোফোনের দাম ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। শাওমি, স্যামসাং, ভিভোসহ প্রায় সব বড় ব্র্যান্ডই দাম বাড়ানোর তালিকায় ছিল। ব্যবসায়ীরা তখন যুক্তি দেন, বৈশ্বিক বাজারে এআই–সমর্থিত চিপসেট, মেমোরি ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক উপকরণের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় অনিবার্য ছিল। তাঁদের দাবি, বাংলাদেশ একা নয়—ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও একই সময়ে মুঠোফোনের দাম বেড়েছে।

কিন্তু এর মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মুঠোফোন আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক ছাড় ঘোষণা করে। আমদানিকৃত হ্যান্ডসেটের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয় এবং দেশে সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে দেওয়া সহজ করা। শুল্ক ছাড় ঘোষণার পরপরই আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা আশ্বাস দেন, ফেব্রুয়ারির শুরু হওয়ার আগেই বাজারে মুঠোফোনের দাম কমে আসবে।

তবে বাস্তব চিত্র নিয়ে সন্দিহান অনেক ভোক্তা ও বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, যে দামে ফোনগুলো জানুয়ারির শুরুতেই বাড়ানো হয়েছে, এখন সেই বাড়তি অংশ থেকে কিছুটা কমিয়ে ‘দাম কমেছে’ বলা হবে। অর্থাৎ শুল্ক কমার ফলে যে প্রকৃত সুবিধা ভোক্তার পাওয়ার কথা ছিল, তা কার্যত ব্যবসায়ীদের হাতেই থেকে যাবে। এই পরিস্থিতিকে অনেকে বাজার ব্যবস্থাপনার এক ধরনের কৌশল হিসেবেও দেখছেন।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘অফিশিয়াল’ ও ‘আনঅফিশিয়াল’—এই দুই ধরনের মুঠোফোন বাজার পাশাপাশি চলেছে। তুলনামূলক কম দামের কারণে বৈধ প্রক্রিয়ায় না আনা ফোনের চাহিদাই ছিল বেশি। বৈধ ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করতেন, আনঅফিশিয়াল বাজারে চোরাই ও রিফার্বিশড সেট বিক্রি হওয়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং গ্রাহকরাও প্রতারিত হচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর চালুর ঘোষণা দেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল অবৈধ ও অনিবন্ধিত মুঠোফোনের ব্যবহার বন্ধ করা।

এনইআইআর চালুর ঘোষণার পর আনঅফিশিয়াল ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তাঁরা প্রথমে এর বিরোধিতা করেন, পরে বিভিন্ন সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। চাপের মুখে সরকার দুই দফা এনইআইআর কার্যকরের সময় পিছিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এটি কার্যকর করা হয়। একই দিনে শুল্ক কমানোর ঘোষণাও আসে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ওই দিন থেকেই বাজারে অফিশিয়াল মুঠোফোনের দাম বাড়তে শুরু করে, যা ভোক্তাদের বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে, শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের একটি আমদানিকৃত মুঠোফোনের দাম প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কমার কথা। আর ৩০ হাজার টাকার কম দামের ফোনের ক্ষেত্রে দাম কমতে পারে আনুমানিক দেড় হাজার টাকা। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই হিসাব বাস্তবে পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না। তাঁদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য প্রশাসনিক খরচের কারণে শুল্ক ছাড়ের পুরো সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়।

মুঠোফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের দাবি, এসকেডি বা এসটিএম পদ্ধতিতে আমদানি করা যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক কাঠামো জটিল হওয়ায় বাস্তবে দাম কমার প্রভাব খুবই সীমিত হবে। ফলে দেশে সংযোজিত ফোনের দাম মডেলভেদে সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কমতে পারে, এর বেশি নয়।

এদিকে বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুল্ক ছাড় ঘোষণার আগেই যে দাম বাড়ানো হয়েছিল, তার ফলে অনেক জনপ্রিয় মডেলের দাম আগের তুলনায় এখনো বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৪ জিবি র‍্যাম ও ৬৪ জিবি রমের একটি জনপ্রিয় বাজেট ফোনের দাম গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে প্রায় ২ হাজার টাকা বেড়েছে। মাঝারি ও উচ্চমূল্যের মডেলগুলোর ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির অঙ্ক আরও বেশি। ফলে ভবিষ্যতে দাম কিছুটা কমলেও, সেটি মূলত এই বাড়তি অংশ থেকেই সমন্বয় করা হবে—এমন আশঙ্কাই প্রবল।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতিতে কঠোর নজরদারির দাবি তুলেছে। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, দেশে যখনই সরকার কোনো পণ্যের ওপর শুল্ক কমায়, তখন তার সুফল ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে সেটি নিজেদের মুনাফায় পরিণত করেন। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব ছাড় দিয়ে যে উদ্দেশ্য সাধন করতে চায়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের একাংশ মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে শুধু শুল্ক কমানো নয়, বরং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এনইআইআর চালু থাকলে গ্রে মার্কেট ধীরে ধীরে কমবে, কিন্তু একই সঙ্গে শুল্ক কাঠামো আরও যৌক্তিক না হলে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হতে পারে। এতে দাম কমার বদলে উল্টো বাড়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।

সব মিলিয়ে, শুল্ক কমার ঘোষণায় মুঠোফোনের দাম কমবে—এই প্রত্যাশা যেমন আছে, তেমনি বাস্তবে তার প্রতিফলন নিয়ে সংশয়ও কম নয়। আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন চালান বাজারে এলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। তবে আপাতত ভোক্তাদের মনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—শুল্ক ছাড়ের সুফল কি সত্যিই তাঁদের হাতে পৌঁছাবে, নাকি এটি আবারও কেবল ব্যবসায়ীদের লাভের অঙ্কই বাড়াবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত