রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ২০ লাখের পথে হতাহত, মানবিক বিপর্যয় চরমে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ বার
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ২০ লাখের পথে হতাহত, মানবিক বিপর্যয় চরমে

প্রকাশ: ২৮  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। প্রায় চার বছর ধরে চলা এই সংঘাতে দুই দেশের মিলিত সামরিক হতাহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রভাবশালী থিংক ট্যাংক। নিহত, আহত ও নিখোঁজ—সব মিলিয়ে এই সংখ্যাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো একক সংঘাতে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ পরিসংখ্যানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মার্কিন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) স্থানীয় সময় মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক মোট সামরিক হতাহতের সংখ্যা ১৮ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান সংঘাতের গতি ও তীব্রতা বিবেচনায় নিয়ে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ২০২৬ সালের বসন্ত নাগাদ এই সংখ্যা দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে।

সিএসআইএস-এর হিসাবে, রাশিয়ার পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ সামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আনুমানিক ৩ লাখ ২৫ হাজার সেনা নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাকি অংশ আহত বা নিখোঁজ। গবেষণায় বলা হয়েছে, রাশিয়ান বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেও সেই অগ্রগতির মূল্য দিতে হয়েছে বিপুল মানবিক ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। সংস্থাটি মন্তব্য করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোনো যুদ্ধে এত বড় মাত্রার সামরিক হতাহতের নজির দেখা যায়নি।

অন্যদিকে ইউক্রেনীয় বাহিনীও এই যুদ্ধে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। সিএসআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের সামরিক হতাহতের সংখ্যা পাঁচ লাখ থেকে ছয় লাখের মধ্যে। এর মধ্যে এক লাখ থেকে এক লাখ ৪০ হাজার পর্যন্ত সেনা নিহত হয়েছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই হিসাব ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে।

যদিও যুদ্ধরত দুই পক্ষের পক্ষ থেকেই হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি ও তথ্য প্রকাশ করা হয়, তবে স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ এই সংঘাতের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। সিএসআইএস বলছে, রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষের সম্মিলিত হতাহতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ১৮ লাখ ছাড়িয়ে গেছে এবং চলমান পরিস্থিতিতে তা আরও বাড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অবশ্য সরকারি হিসাবে তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যার কথা উল্লেখ করেছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেন প্রায় ৪৬ হাজার সেনা হারিয়েছে। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষক ও স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে, কারণ যুদ্ধকালীন সময়ে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে।

রাশিয়ার হতাহতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিভ্রান্তি ও অস্বচ্ছতা দেখা যায়। বিবিসির রাশিয়ান সার্ভিস এবং স্বাধীন অনুসন্ধানী মাধ্যম মিডিয়াজোনা প্রকাশ্য তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া মৃত্যু সংবাদ এবং স্থানীয় প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, চার বছরের যুদ্ধে নিহত রুশ সেনার সংখ্যা অন্তত এক লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। তবে তারাও স্বীকার করেছে, প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি, কারণ অনেক মৃত্যু আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়নি।

সামরিক হতাহতের পাশাপাশি এই যুদ্ধ ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জীবনেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউক্রেনে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর সংখ্যা আগের যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি ছিল, এমনকি যুদ্ধ শুরুর বছর ২০২২ সালের চেয়েও। অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং গোলাবর্ষণের ফলে শহর ও গ্রামগুলোতে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর জানিয়েছে, শুধু ২০২৫ সালেই ইউক্রেনে দুই হাজার ৫০০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজারেরও বেশি। সংস্থাটি আরও জানায়, ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ১৫ হাজার বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনা যাচাই করেছে। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ অনেক এলাকা দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্র হওয়ায় সেখানে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধ কেবল দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, ইউক্রেনের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং একটি প্রজন্ম যুদ্ধের মানসিক আঘাত বহন করে বড় হচ্ছে।

সিএসআইএস-এর বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং বিপুল হতাহতের পরও কৌশলগতভাবে কোনো পক্ষই এখনো নির্ণায়ক বিজয়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। রাশিয়া ধীরে ধীরে কিছু অঞ্চলে অগ্রসর হলেও তা ধরে রাখতে তাদের প্রচুর সেনা ও রসদ ব্যয় করতে হচ্ছে। অপরদিকে ইউক্রেন পশ্চিমা সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধ দেশটির মানবসম্পদ ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলে আবারও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জোরালো হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে হতাহতের সংখ্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের দিকে সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে সামরিক ও বেসামরিক—উভয় পর্যায়েই প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণে বাড়বে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; প্রতিটি সংখ্যা একটি হারানো জীবন, ভেঙে পড়া পরিবার এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের প্রতীক। প্রায় ২০ লাখ হতাহতের এই বাস্তবতা বিশ্বকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিনির্ভর হলেও এর মানবিক মূল্য এখনো অসীম এবং গভীর বেদনাদায়ক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত