সাঈদুর রহমান হত্যা: ৫ জনের মৃত্যুদণ্ডে দশ বছরের বিচার শেষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
সাঈদুর রহমান হত্যা: ৫ জনের মৃত্যুদণ্ডে দশ বছরের বিচার শেষ

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গোপালগঞ্জ জেলা মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা সাঈদুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক দশক পর আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আজ বুধবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল-১ পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। একই সঙ্গে চার আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং আরও ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ রায়ের মাধ্যমে নৃশংস এক হত্যাকাণ্ডের বিচারিক পরিসমাপ্তি ঘটল, যা দীর্ঘদিন ধরে গোপালগঞ্জসহ দেশের শ্রমিক সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ছিল।

ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল-১–এর বিচারক মো. রহিবুল ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এস এম শরীফুল ইসলাম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে আসামিদের দোষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এই দণ্ড প্রদান করেছেন।

আদালত ও আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় গোপালগঞ্জ শহরের জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে সাঈদুর রহমানের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র নিয়ে একদল হামলাকারী তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে সাঈদুর রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন সকালে তিনি মারা যান।

সাঈদুর রহমানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং পুরো শ্রমিক সমাজের জন্য ছিল গভীর শোক ও ক্ষতির ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি গোপালগঞ্জ জেলা মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং শ্রমিক অধিকার আদায়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতেন। তাঁর নেতৃত্ব ও প্রভাব অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও, অন্য একটি মহলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল বলে মামলার নথিপত্রে উঠে এসেছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহত সাঈদুরের ভাই রাসু বাদী হয়ে গোপালগঞ্জ সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণের পর আজ রায় ঘোষণা করা হলো। মামলার বিভিন্ন ধাপে সাক্ষ্য দেন প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্টরা।

রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি তুলে ধরে জানায়, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সাঈদুর রহমানকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করার মাধ্যমে এলাকায় ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, এমন অপরাধ সমাজে শৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি এবং এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে নিহতের স্বজনদের মধ্যে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। সাঈদুরের পরিবারের সদস্যরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা এই রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের ভাষায়, “আমরা ভাইকে ফিরে পাব না, কিন্তু ন্যায়বিচার পেয়েছি—এটাই আমাদের বড় সান্ত্বনা।”

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। তাঁদের দাবি, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তবে আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও আলামত আসামিদের অপরাধ প্রমাণে যথেষ্ট।

এই মামলার রায় দেশের শ্রমিক রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, শ্রমিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সহিংসতা বন্ধে এটি একটি শক্ত বার্তা দেবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলার নিষ্পত্তি বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

গোপালগঞ্জে সাঈদুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরপরই যে উত্তেজনা ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও অনেকের স্মৃতিতে তাজা। সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও শোকসভায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা। সেই সময় দ্রুত বিচার ও দোষীদের শাস্তির দাবি উঠেছিল সর্বমহলে। আজকের রায়ের মাধ্যমে সেই দাবির প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

দশ বছর পর এই রায় প্রমাণ করে, বিচার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সাঈদুর রহমান হত্যাকাণ্ডের রায় শুধু একটি মামলার সমাপ্তি নয়, বরং এটি দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত