প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশি-বিদেশি কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা ও কৌতূহল চলমান। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নেবে না। বাংলাদেশের জনগণ যে সরকারকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করবে, যুক্তরাষ্ট্র সেই সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত থাকবে। তাঁর এই বক্তব্যকে নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্বাচন কমিশনের প্রধানের সঙ্গে এটি ছিল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। বৈঠকে ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে মার্কিন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিল।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, সে বিষয়ে সিইসি তাঁকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেছেন। নির্বাচন পরিচালনার নীতিমালা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও জনগণের মতামতকে সম্মান করে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একই রকম। তিনি স্পষ্ট করে জানান, যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দল বা পক্ষের প্রতি সমর্থন জানাবে না। বরং নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হলে এবং জনগণের রায়ে যে সরকার নির্বাচিত হবে, যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গেই সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে তাঁর মনোনয়ন শুনানির সময়ও তিনি বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে নিজের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছিলেন। সে প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায় এবং এর ফলাফল দেখার বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবেও আগ্রহী। তাঁর ভাষায়, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের মতামতের প্রতিফলন দেখতে পারা সব সময়ই আনন্দের।
বৈঠকের আলোচনায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পায়। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচন প্রস্তুতির সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে জানান, নির্বাচন কমিশন একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে কাজ করছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনকালীন আচরণবিধি বাস্তবায়নের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
ক্রিস্টেনসেন বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও ব্যাখ্যা তাঁকে আশাবাদী করেছে। তিনি মনে করেন, সঠিক প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্বাচন একটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি জনগণের অংশগ্রহণ ও আস্থার বিষয়। তাই সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণই একটি সফল নির্বাচনের মূল চাবিকাঠি।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথাও সাংবাদিকদের জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, নির্বাচন হবে উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণমূলক। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন নিজেও একই প্রত্যাশার কথা জানান। তাঁর মতে, নির্বাচন মানে শুধু ভোটগ্রহণের দিন নয়; এটি একটি জাতীয় উৎসবের মতো হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ নির্বিঘ্নে ও ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনের সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক দেখা যায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা থাকে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ‘কোনো পক্ষ নেবে না’ বক্তব্যকে অনেকেই একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ না করার নীতিকেই তুলে ধরে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে কথা বলে আসছে। তবে তারা কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটকে সমর্থন করার অবস্থান নেয়নি। বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, মানবাধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও ব্রিফিংয়ের অংশ হিসেবেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কমিশন মনে করে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নির্বাচন প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করা হলে বিভ্রান্তি কমে এবং আস্থা বাড়ে। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে সাধারণত নির্বাচনকালীন পরিবেশ, সহিংসতা প্রতিরোধ, ভোটার উপস্থিতি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য সেই ধারার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, বড় শক্তিগুলোর অবস্থান নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে ‘পক্ষ না নেওয়ার’ ঘোষণা দেওয়ায় নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি একটি স্বস্তির বার্তা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ঢাকায় নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের বক্তব্য বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। তিনি যেমন নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির প্রশংসা করেছেন, তেমনি জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখানোর অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এখন দেখার বিষয়, এই প্রত্যাশার আলোকে নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়।