প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউক্রেনে যুদ্ধের তীব্রতা নতুন করে বেড়েছে। শান্তি আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার খবরের মধ্যেই রাশিয়া দেশটির বিভিন্ন শহরে হামলা জোরদার করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করেছে মস্কো। রুশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ জানিয়েছেন, চলতি জানুয়ারি মাসেই ইউক্রেনের অন্তত ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে রাশিয়া। এই দাবি এমন এক সময়ে এলো, যখন যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলে বৈঠক ও আলোচনার সংখ্যা বাড়ছে এবং সম্ভাব্য শান্তি কাঠামো নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে রুশ হামলার তীব্রতা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে স্পষ্টভাবে বেড়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে দক্ষিণের বন্দরনগরী ওডেসায় রাশিয়ার ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীও রয়েছেন, যা এই সংঘাতের মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তুলেছে। হামলায় আবাসিক ভবন ছাড়াও একটি গির্জা, কিন্ডারগার্টেন এবং একটি উচ্চবিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জ্বালানি অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
ওডেসা ইউক্রেনের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জন্য একটি কৌশলগত শহর। কৃষিপণ্য রপ্তানি ও সমুদ্রবন্দর কার্যক্রমের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে হামলা ইউক্রেনের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাতভর সাইরেনের শব্দ ও বিস্ফোরণের আতঙ্কে তারা ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক পরিবার এখনও ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
এর আগে ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বড় শহর খারকিভেও রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। স্থানীয় মেয়রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম জানিয়েছে, শহর ও আশপাশের অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা সাময়িকভাবে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নির্দিষ্ট একটি অবকাঠামো লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এর প্রভাব পড়ে বিস্তৃত আবাসিক এলাকায়। অন্তত ১৬টি বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। বারবার বিমান হামলার আশঙ্কায় মেরামতকাজ ব্যাহত হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই হামলাগুলোর মধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতির দাবি করেছে রাশিয়া। জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ এক বিবৃতিতে বলেন, জানুয়ারি মাসে ইউক্রেনের ১৭টি বসতি রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় মোট ৫০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি ভূমি এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। যদিও ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এই দাবির বিষয়ে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি, কিয়েভ বরাবরই বলে আসছে যে রাশিয়ার দাবি অনেক ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত বা বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
যুদ্ধের মাঠে এই অগ্রগতির দাবির পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও নানা নাটকীয় তথ্য সামনে আসছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভবিষ্যতে কিয়েভকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার বিনিময়ে ইউক্রেনকে দনবাস অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন যদি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গ্যারান্টি পেতে চায়, তাহলে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের যেসব অংশ এখনও কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখান থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অংশ হতে পারে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। আটজন অবগত সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আলোচক মনে করছেন, যুদ্ধ বন্ধে বাস্তবসম্মত সমঝোতার জন্য ইউক্রেনকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তবে এই দাবি দ্রুতই নাকচ করেছে হোয়াইট হাউস। যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আনা কেলি এক বিবৃতিতে বলেন, প্রতিবেদনটি ভুল ও বিভ্রান্তিকর। তাঁর ভাষায়, শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র ভূমিকা হলো দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসতে উৎসাহিত করা; ইউক্রেনের ভূখণ্ড নিয়ে কোনো শর্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়।
ইউক্রেন সরকারও বারবার বলে আসছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বিভিন্ন সময়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দনবাসসহ দখলকৃত সব অঞ্চল পুনরুদ্ধারই ইউক্রেনের লক্ষ্য। তবে যুদ্ধের দীর্ঘায়ন, মানবিক ক্ষতি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে সমঝোতার নানা প্রস্তাব ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামরিক হামলা জোরদার করে আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার কৌশলই এখন অনুসরণ করছে রাশিয়া। যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতির দাবি তুলে ধরে মস্কো সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় বাড়তি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে, ইউক্রেন পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। ওডেসা ও খারকিভের সাম্প্রতিক হামলা আবারও দেখিয়ে দিল, যুদ্ধ থামার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনও নেই।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একদিকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে মাঠের বাস্তবতা ক্রমেই আরও কঠোর হয়ে উঠছে। শান্তি আলোচনার খবরের পাশাপাশি হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির এই বৈপরীত্য ইউক্রেন যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাশিয়ার ৫০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি দখলের দাবি কতটা বাস্তব, তা যাচাই করা কঠিন হলেও এতে স্পষ্ট যে সংঘাত এখনো শেষের পথে নয়। বরং নতুন বছরের শুরুতেই এই যুদ্ধ আরও রক্তক্ষয়ী ও অনিশ্চিত অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।