ভারতে নিপাহ আতঙ্ক, এশিয়ার বিমানবন্দরজুড়ে উচ্চ সতর্কতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৬ বার
ভারতে নিপাহ আতঙ্ক, এশিয়ার বিমানবন্দরজুড়ে উচ্চ সতর্কতা

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাব শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে গোটা এশিয়া অঞ্চলে। সীমান্তবর্তী দেশগুলোসহ একাধিক এশীয় দেশের বিমানবন্দরগুলোতে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং জোরদার করা হয়েছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা ফ্লাইটের ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

চলতি মাসের শুরুতেই পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার খবর সামনে আসে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, অন্তত পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মী এই মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের সংস্পর্শে আসা অন্তত ১১০ জনকে দ্রুত কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। আক্রান্ত ও সন্দেহভাজনদের পর্যবেক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

নিপাহ ভাইরাসকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর জুনোটিক ভাইরাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়াতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে প্রতিরোধই একমাত্র ভরসা।

ভারতে নতুন করে নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, থাইল্যান্ড কর্তৃপক্ষ দেশটির তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেসব ফ্লাইট সেখানে অবতরণ করছে, সেসব ফ্লাইটের যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্নপত্র পূরণ এবং প্রয়োজনে আলাদা করে মেডিকেল স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে, যাতে সন্দেহভাজন কোনো যাত্রী দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

ভারতের আরেক প্রতিবেশী দেশ নেপালও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত যাত্রীদের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। শুধু আকাশপথ নয়, ভারত-নেপাল স্থলবন্দরগুলোতেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা কঠোর করা হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে পর্যবেক্ষণে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নেপাল সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাস মূলত ফল খেকো বাদুড় ও শূকরের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে বা তাদের দেহ নিঃসৃত তরল মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণ ঘটতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দূষিত খাবার বা ফলের মাধ্যমেও ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এছাড়া মানুষের শরীর থেকে মানুষের শরীরেও নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, হাসপাতাল বা পরিবারে আক্রান্ত ব্যক্তির সেবাযত্ন করতে গিয়ে অনেক সময় অন্যরাও সংক্রমিত হন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিপাহ ভাইরাসকে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দশটি রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। সংস্থাটির মতে, উপযুক্ত প্রস্তুতি ও দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই ভাইরাস মহামারির রূপ নিতে পারে। এ কারণে নিপাহ ভাইরাসের ওপর বৈশ্বিক পর্যায়ে গবেষণা ও নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। একই সঙ্গে সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।

নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে উপসর্গ সব সময় একরকম নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণের শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণই দেখা যায় না, যা রোগ শনাক্তকে আরও কঠিন করে তোলে। তবে সাধারণভাবে প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশী ব্যথা, বমি ভাব ও গলা ব্যথা দেখা দিতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে তন্দ্রাচ্ছন্নতা, চেতনার পরিবর্তন এবং শ্বাসকষ্টজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণও দেখা যায়। রোগের অবস্থা গুরুতর হলে এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায়। সে সময় দেশটির শূকর খামারিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী সিঙ্গাপুরেও সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। যে গ্রামে প্রথম ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছিল, সেই গ্রামের নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয় নিপাহ ভাইরাস। এরপর থেকে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে পর্যায়ক্রমে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।

বাংলাদেশেও অতীতে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে কাঁচা খেজুরের রসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ কারণে প্রতিবছর স্বাস্থ্য বিভাগ কাঁচা খেজুরের রস পান না করার জন্য জনগণকে সতর্ক করে থাকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশেও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা ও দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক যাতায়াতের ক্ষেত্রে কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নতুন করে এশিয়া অঞ্চলের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এই ভাইরাস দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, তথ্য বিনিময় এবং জনসচেতনতার মাধ্যমেই কেবল এই মারাত্মক ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত