প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পার হতে না হতেই বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির মানচিত্রে স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে বহুদিনের মিত্রদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি করছে, তখন সেই শূন্যতা পূরণে ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। এক সময় যে চীনকে শ্লথ অর্থনীতি, রপ্তানি সংকোচন ও পশ্চিমা চাপের মুখে দুর্বল হতে থাকা শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেই দেশটিই এখন নতুন বাস্তবতায় অনেক দেশের কাছে তুলনামূলকভাবে ‘স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এক বছরের নীতিগত অবস্থান বিশ্বকে নতুন করে চীনের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অনিশ্চয়তা, উচ্চ শুল্ক আরোপ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে বহু দেশ বিকল্প অংশীদার খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেইজিং কেবল নতুন বাজার খুঁজে নেয়নি, বরং বিদ্যমান অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেছে। এর ফল হিসেবে ২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত পৌঁছেছে রেকর্ড এক লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে, যা দেশটির অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ। মাসিক গড়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ চীনের আর্থিক সক্ষমতাকে দৃশ্যমানভাবে বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইউয়ানের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশ এমনকি কিছু উন্নত অর্থনীতিও এখন বাণিজ্য ও বিনিয়োগে ইউয়ানকে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ডলারনির্ভর বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
বোস্টন কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক আলেক্সান্দার তোমিক মনে করেন, প্রায় ২০ লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতি এবং ৪৫ লাখ কোটি ডলারের স্টক ও বন্ড বাজারের সহায়তায় চীন এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে অনেক দেশের কাছে তারা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ অংশীদার। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অস্থিরতা এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার বিপরীতে চীন নিজেদের স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে। একই সুরে অল স্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টের বিশ্লেষক ডেরিক আরউইন বলেন, নিজেদের আস্থাযোগ্য ও স্থিতিশীল বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে চীন সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন অবশ্য নতুন নয়। প্রযুক্তি, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও বাণিজ্য ঘিরে দুই দেশের দ্বন্দ্ব গত কয়েক বছর ধরেই চলমান। গেল এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপ করে, যা পরবর্তীতে কিছুটা কমানো হলেও দুই দেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চীনের যুক্তরাষ্ট্রমুখী রপ্তানিতে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের রপ্তানি কমে যায় প্রায় ২০ শতাংশ। তবে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চীন দ্রুত বিকল্প বাজারে মনোযোগ দেয়।
পরিসংখ্যান বলছে, একই সময়ে আফ্রিকায় চীনের রপ্তানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সংকুচিত হলেও বিশ্ব বাণিজ্যের অন্য প্রান্তে চীন তার অবস্থান আরও শক্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈচিত্র্যময় রপ্তানি কৌশলই চীনের অর্থনীতিকে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ সামলাতে সহায়তা করেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের চীন সফর। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেইজিং সফরে গেলেন। চার দিনের এই সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। স্টারমারের সফরের আগেই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চীন সফর করেছেন, যা পশ্চিমা দেশগুলোর বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীন সফরের আগে দেওয়া এক বক্তব্যে কিয়ার স্টারমার বলেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে পারলে যুক্তরাজ্য আরও নিরাপদ ও ধনী হতে পারে। তাঁর মতে, এই সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের জীবনেও প্রতিফলিত হবে। স্টারমার দাবি করেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লে মানুষের পকেটে টাকা আসবে এবং যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, আগের রক্ষণশীল সরকারগুলো চীনের বিষয়ে কখনও উষ্ণ, কখনও শীতল নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি এই অবস্থাকে ‘সোনালি যুগ থেকে বরফ যুগে যাত্রা’ হিসেবে আখ্যা দেন। স্টারমারের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই দোলাচল নীতি পরিহার করে বাস্তবভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সময় এসেছে। তাঁর এই অবস্থান অবশ্য যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক স্টারমারের বিরুদ্ধে চীনের কাছে ‘নতজানু’ হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, মানবাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে স্টারমার এসব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, শক্ত অবস্থান নিয়েই বাস্তববাদী কূটনীতি চালানো সম্ভব।
সফরকালে স্টারমার বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ইস্যু গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে তিনি সাংহাই সফর করবেন, যেখানে চীনের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখান থেকে তাঁর জাপান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে, যা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাজ্যের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদারের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এক বছরের নীতির ফলেই এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে। এই বাস্তবতায় চীন শুধু অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেই নয়, বরং কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হিসেবেও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে। আগামী দিনে এই চীনমুখী ঝোঁক বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে কী ধরনের পরিবর্তন আনে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্ব।