প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের শীর্ষ ই-কমার্স ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন আবারও বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। চলমান পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী আরও ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। এর ফলে গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া কর্মী সংকোচনের ধারাবাহিকতায় মোট ছাঁটাইয়ের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজারে পৌঁছাতে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, স্বয়ংক্রিয়তার দিকে ঝোঁক এবং করপোরেট কাঠামোকে আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যামাজন কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত বছরের অক্টোবর মাসে অ্যামাজন প্রথম দফায় ১৪ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল। সে সময় থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এখানেই থেমে থাকবে না। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় আরও বড় পরিসরের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করল।
বুধবার অ্যামাজনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বেথ গ্যালেটি এক বিবৃতিতে বলেন, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক স্তর কমানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা। তার ভাষায়, “আমরা চাই আমাদের টিমগুলো আরও বেশি দায়িত্বশীল হোক, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারুক এবং উদ্ভাবনের গতি বাড়াতে সক্ষম হোক। বর্তমান কাঠামোতে কিছু জায়গায় অতিরিক্ত স্তর ও জটিলতা তৈরি হয়েছিল, যা সরল করা জরুরি হয়ে পড়েছে।”
অ্যামাজন কর্তৃপক্ষের মতে, এই ছাঁটাই কোনো নিয়মিত বা রুটিন প্রক্রিয়ার অংশ নয়। বরং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বিশেষ করে এআই ও স্বয়ংক্রিয়তার বিস্তৃত ব্যবহার কর্মক্ষেত্রে যে মৌলিক রূপান্তর ঘটাচ্ছে, তারই প্রতিফলন এই সিদ্ধান্ত। গ্যালেটি আরও বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে অনলাইন কেনাকাটার চাহিদা হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তখন গ্রাহকদের চাপ সামাল দিতে এবং দ্রুত সেবা দিতে অ্যামাজন বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করেছিল। কিন্তু মহামারি-পরবর্তী সময়ে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাজের পরিমাণ বাড়ায় অতিরিক্ত জনবল আর আগের মতো প্রয়োজন হচ্ছে না।
এই ছাঁটাই ঘোষণার আগেই অ্যামাজনের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। মঙ্গলবার অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস বা এডব্লিউএস-এর কিছু কর্মীকে ভুলবশত একটি ইমেল পাঠানো হয়, যেখানে ছাঁটাই পরিকল্পনাকে ‘প্রজেক্ট ডন’ নামে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই ইমেল দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার কর্মীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। পরবর্তীতে কোম্পানি জানায়, এটি ছিল একটি প্রশাসনিক ভুল, তবে ততক্ষণে কর্মীদের মধ্যে আশঙ্কা আরও গভীর হয়ে ওঠে।
অ্যামাজনের অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, সম্ভাব্যভাবে যেসব ইউনিট এই ছাঁটাইয়ের প্রভাব অনুভব করতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে অ্যালেক্সা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, প্রাইম ভিডিও, ডিভাইস বিভাগ, বিজ্ঞাপন, লাস্ট মাইল ডেলিভারি, কিঙ্কল এবং সাপ্লাই চেইন অপ্টিমাইজেশন ইউনিট। যদিও কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে কোন বিভাগ বা কোন অঞ্চলে কতজন কর্মী ছাঁটাই হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি।
প্রযুক্তি খাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের এই প্রবণতা নতুন নয়। তবে অ্যামাজনের মতো একটি জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের এত বড় পরিসরের সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে বড় বার্তা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ও রোবোটিক্সের দ্রুত অগ্রগতির ফলে করপোরেট চাকরির ধরন বদলে যাচ্ছে। যেসব কাজ আগে মানুষের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেগুলোর বড় অংশ এখন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে দক্ষতার ধরনও বদলাচ্ছে, আর অনেক প্রচলিত পদ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে।
অ্যামাজন ইতোমধ্যেই তার ই-কমার্স কার্যক্রমে প্যাকেজিং, গুদাম ব্যবস্থাপনা ও ডেলিভারি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে রোবোটিক্সে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। স্বয়ংক্রিয় রোবট ব্যবহারের মাধ্যমে কম সময়ে বেশি পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে, যা খরচ কমানোর পাশাপাশি ডেলিভারি সময়ও হ্রাস করছে। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকদের জন্য আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করবে।
তবে কর্মী ছাঁটাইয়ের মানবিক দিকটি উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। হাজার হাজার কর্মীর চাকরি হারানোর খবরে অনেক পরিবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। প্রযুক্তি খাতের উচ্চ বেতনের চাকরি হলেও হঠাৎ চাকরি হারানো মানসিক চাপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এআই যুগে টিকে থাকতে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
অ্যামাজন জানিয়েছে, ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় তারা কর্মীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং নতুন চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে কর্মীদের একাংশের মতে, এত বড় পরিসরের ছাঁটাই করপোরেট সংস্কৃতিতে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুদের হার বৃদ্ধি এবং ভোক্তা ব্যয়ের ওঠানামার মধ্যেই অ্যামাজনের এই সিদ্ধান্ত এসেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন লাভজনকতা ও দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোই প্রধান লক্ষ্য। অ্যামাজনের এই ছাঁটাই সেই বৈশ্বিক প্রবণতারই একটি বড় উদাহরণ।
সব মিলিয়ে, এআই নির্ভর ভবিষ্যতের দিকে এগোতে গিয়ে অ্যামাজন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও করপোরেট পুনর্গঠন একসঙ্গে চলবে, যদিও তার মূল্য দিতে হচ্ছে হাজার হাজার কর্মীকে। এই সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে, যেখানে দক্ষতা, অভিযোজন ক্ষমতা ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই হয়ে উঠবে টিকে থাকার প্রধান চাবিকাঠি।