প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় ক্রু ও যাত্রীসহ বিমানে থাকা ১৫ জনের সবাই নিহত হয়েছেন। দেশটির উত্তরের ভেনেজুয়েলা সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে যাত্রীবাহী একটি ছোট বিমান বিধ্বস্ত হলে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা সাতেনা (SATENA) দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিসহ একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, দুর্ঘটনাটি কলম্বিয়াজুড়ে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সাতেনা এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানায়, তাদের বহরে থাকা একটি বিচক্র্যাফট ১৯০০ মডেলের বিমান ‘মারাত্মক দুর্ঘটনার’ শিকার হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ বা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। পরে উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলা সীমান্তের কাছাকাছি একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিমানটির ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। দুর্ঘটনাস্থলটি এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে যাতায়াত অত্যন্ত কঠিন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিও জটিল বলে জানা গেছে।
বিমান সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনএসই ৮৮৪৯ নম্বর ফ্লাইটটি কলম্বিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর কুকুতা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। এর গন্তব্য ছিল ভেনেজুয়েলা সীমান্তের নিকটবর্তী শহর ওকানিয়া। কুকুতা থেকে ওকানিয়ার দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। সাতেনা জানায়, বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে বিমানটির ওকানিয়ায় অবতরণের কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত অবতরণের প্রায় ১১ মিনিট আগেই হঠাৎ করে বিমানটির সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিমানে মোট ১৩ জন যাত্রী এবং দুইজন ক্রু সদস্য ছিলেন। সরকারি যাত্রী তালিকা অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে কলম্বিয়ার আইনপ্রণেতা দিয়োজেনেস কুইন্তেরো আমায়া রয়েছেন। এছাড়া আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী হিসেবে প্রচারণায় যুক্ত কার্লোস সালসেদোর নামও যাত্রী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যু দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সেমানাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নর্তে দে সান্তান্দের প্রদেশের গভর্নর উইলিয়াম ভিয়ামিজার জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। তবে নিখোঁজদের সবাই যে প্রাণ হারিয়েছেন, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কার্যত নিশ্চিত। উদ্ধার অভিযান সম্পূর্ণ করতে আরও সময় লাগতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
যে এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে, সেটি কলম্বিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী ইএলএন (ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি) গেরিলাদের প্রভাবাধীন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ফলে উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনায় বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কলম্বিয়ার সশস্ত্র বাহিনী অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে। সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, “এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোদের জন্য আমি গভীরভাবে শোকাহত। নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আমার সমবেদনা।” প্রেসিডেন্টের এই শোকবার্তা দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিহতদের প্রতি সম্মান জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দুর্ঘটনা কলম্বিয়ার আঞ্চলিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে। বিচক্র্যাফট ১৯০০ মডেলের বিমান সাধারণত স্বল্প দূরত্বের অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে উড্ডয়ন ও অবতরণে এ ধরনের বিমানের ওপর নির্ভরতা থাকলেও আবহাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা মানবিক ভুল—সবকিছুই দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কলম্বিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। ফ্লাইটের প্রযুক্তিগত অবস্থা, পাইলটদের শেষ যোগাযোগ, আবহাওয়ার পরিস্থিতি এবং রাডার ডেটা—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা হবে। কর্তৃপক্ষের দাবি, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা হবে না।
এদিকে নিহতদের পরিবারগুলোর মধ্যে শোক আর হতাশার আবহ বিরাজ করছে। অনেক স্বজন এখনো প্রিয়জনের মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। স্থানীয় প্রশাসন নিহতদের পরিবারকে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, আকাশপথে যাতায়াত যতই আধুনিক হোক না কেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্ব অপরিহার্য। কলম্বিয়ার এই মর্মান্তিক বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা শুধু একটি দেশের নয়, বরং বৈশ্বিক বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিও নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।