ভোরের ঢাকা: ছিনতাইয়ের গুলিতে মুদি দোকানি, ছুরিকাঘাতে শ্রমিক আহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৯ বার
ভোরের ঢাকা: ছিনতাইয়ের গুলিতে মুদি দোকানি, ছুরিকাঘাতে শ্রমিক আহত

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকায় ভোরের নীরবতা ভেঙে আবারও রক্ত ঝরল। একদিকে মিরপুরের পল্লবীতে ছিনতাইকারীর গুলিতে আহত হলেন এক মুদি দোকানি, অন্যদিকে খিলক্ষেতে কাজে ফেরার পথে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হলেন এক নির্মাণশ্রমিক। আলাদা দুটি স্থানে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় আবারও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শীতের ভোরে কর্মজীবী মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের মধ্যেই সংঘটিত এসব ঘটনা নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীর মিরপুর-১২ নম্বর এলাকার পল্লবী থানাধীন ই ব্লকে প্রথম ঘটনাটি ঘটে। বাসার নিচে দাঁড়িয়ে ধূমপান করার সময় ছিনতাইকারীর গুলিতে আহত হন মুদি দোকানি মোহাম্মাদ হোসেন দীপু। বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর। ঘটনার পর দ্রুত তাকে প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আহত দীপুর স্ত্রী আফরোজা আক্তার জানান, তাদের বাসার নিচেই একটি ছোট মুদি দোকান রয়েছে। প্রতিদিনের মতো ভোরের দিকে দীপু বাসা থেকে বের হয়ে দোকানের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করছিলেন। তখনও কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি টের পাননি তিনি। হঠাৎ করে একটি মোটরসাইকেলে করে তিনজন যুবক ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। প্রথমে তাদের দেখে সন্দেহ হয়নি, কারণ ওই এলাকায় ভোরে বিভিন্ন লোকজনের চলাচল স্বাভাবিক ঘটনা।

দীপুর শ্যালক শুভ বলেন, ভোরে হঠাৎ বাসার সামনের রাস্তায় চিৎকার শুনে তারা সবাই আতঙ্কিত হয়ে বাইরে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, দীপু রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। তখনই জানতে পারেন, তিনি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছেন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা জানান, দীপুর বাম পায়ে গুলি লেগেছে। তবে সৌভাগ্যক্রমে গুলিটি শরীরের ভেতরে আটকে না থেকে পায়ের অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এতে প্রাণঘাতী ঝুঁকি কমলেও তাকে এখনও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা দীপু ঘটনার বর্ণনায় বলেন, তিনি যখন ধূমপান করছিলেন, তখন মোটরসাইকেলটি একটু দূরে থামে। এরপর ধীরে ধীরে তিনজন তার কাছে আসে। হঠাৎ একজন ছুরি বের করে তার কাছে থাকা সব কিছু বের করে দিতে বলে। কথা বলার সুযোগ না দিয়েই তারা তার পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে নেয়। এরপর ফোন নিতে গেলে তিনি বাধা দেন। তখনই ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে পেছন থেকে আরেকজন গুলি চালায়। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার মানিব্যাগে শ্যালক শুভর বিয়ের কেনাকাটার জন্য রাখা সতেরো হাজার টাকা ছিল। সবকিছু নিয়েই ছিনতাইকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়।

এদিকে, একই ভোরে রাজধানীর আরেক প্রান্ত খিলক্ষেতে ঘটে আরেকটি নৃশংস ঘটনা। ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত হন মো. লিটন নামের এক নির্মাণশ্রমিক। বয়স আটাশ বছর। তিনিও বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার অবস্থা গুরুতর হলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি আশঙ্কামুক্ত।

লিটনের সহকর্মী মো. মহসিন ইসলাম জানান, তারা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জলসিঁড়ি কোম্পানির একটি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করেন। লিটনের বাড়ি দিনাজপুরে। গ্রামের বাড়ি থেকে কাজে ফেরার পথে রাতে ঢাকায় পৌঁছান তিনি। ভোর চারটার দিকে খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডে নেমে রেললাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তিনজন ছিনতাইকারী তার পথ রোধ করে।

মহসিন বলেন, ছিনতাইকারীরা প্রথমে ছুরি ঠেকিয়ে তার ব্যাগ ও পকেট তল্লাশি শুরু করে। লিটন বাধা দিলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তার বাম কাঁধে পরপর তিনবার ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর তার কাছ থেকে মাত্র পাঁচশ টাকা ও একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে তারা দ্রুত অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় লিটনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. ফারুক জানান, আহত দুজনই জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের শরীরে আঘাত গুরুতর হলেও বর্তমানে তারা চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট থানাকে ঘটনা দুটি জানানো হয়েছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

একই ভোরে রাজধানীর দুটি ভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভোরে কাজে বের হওয়া শ্রমজীবী মানুষ, দোকানি ও নিম্নআয়ের মানুষেরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন। অনেকেই বলছেন, শীতের সময় ভোরে কুয়াশা ও অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ছিনতাইকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

নগরবাসীর মতে, রাজধানীতে নিয়মিত টহল, সিসিটিভি নজরদারি এবং ভোরের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না হলে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড, রেললাইনের আশপাশ, আবাসিক এলাকার নিরিবিলি সড়কগুলোতে ছিনতাইকারীরা সক্রিয় থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই দুই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো, রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আহত দীপু ও লিটনের পরিবার এখন শুধু সুস্থতার প্রার্থনায় ব্যস্ত। কিন্তু একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলছেন, প্রতিদিনের সাধারণ জীবনে কেন মানুষকে এভাবে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবতা হলো, ভোরের ঢাকা এখনও অনেকের কাছে নিরাপদ নয়। এই ঘটনাগুলো শুধু দুটি পরিবারের দুর্ভোগের গল্প নয়, বরং পুরো নগরবাসীর জন্য একটি সতর্কবার্তা—নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত