প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুষ্টিয়ার মাঠজুড়ে এখন সবুজ পেঁয়াজ গাছের সারি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ফলনের আশা ভালোই। কিন্তু সেই সবুজের আড়ালে জমে উঠছে চাষিদের দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা। ভরা মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় কুষ্টিয়ার পেঁয়াজ চাষিরা পড়েছেন গভীর সংকটে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার মিলছে না—এই অভিযোগে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। অনেক এলাকায় দ্বিগুণ দামে সার কিনে কোনোভাবে জমি বাঁচানোর চেষ্টা করছেন তারা। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সময়মতো সার দিতে না পারায় ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।
সরজমিনে কুষ্টিয়ার কুমারখালী, সদর ও মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ চলছে। কোথাও কৃষক জমিতে সেচ দিচ্ছেন, কোথাও আগাছা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে আছেন হতাশ চোখে—কারণ সার নেই। অনেক কৃষক জানান, প্রথম সেচের সময় কিছুটা সার পাওয়া গেলেও দ্বিতীয় সেচে এসে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের ঘাটতিতে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন তারা।
কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়নের পেঁয়াজ চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, “সময়মতো সার না দিলে পেঁয়াজ গাছ বড় হয় না। শুধু পানি দিলে কোনো লাভ নেই। এখন জমিতে গাছ হলদে হয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত দামে সার চাইলে ডিলাররা বলে, সার নেই। কিন্তু বেশি দাম দিলে ঠিকই পাওয়া যায়।” তাঁর মতো অনেক কৃষকই অভিযোগ করছেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।
পেঁয়াজ এমন একটি ফসল, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ না হলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পেঁয়াজ গাছের গোড়ার বৃদ্ধি ও কন্দ বড় হওয়ার সময় পর্যাপ্ত সার না পেলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমানে কুষ্টিয়ার অনেক জমিতে সেই চিত্রই দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু জমিতে পেঁয়াজের পাতা বিবর্ণ হতে শুরু করেছে, কোথাও গাছের বৃদ্ধি থেমে গেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত মৌসুমের অভিজ্ঞতাও চাষিদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক কৃষক জানান, আগের মৌসুমেও তারা ঠিকমতো সার পাননি। তখন বাধ্য হয়ে কম সার দিয়েই চাষ চালাতে হয়েছিল। ফলন আশানুরূপ হয়নি, বাজারে দাম ভালো থাকলেও উৎপাদন কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হয়েছে। এবার যদি একই অবস্থা হয়, তাহলে অনেক কৃষকের পক্ষে খরচই তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার এক কৃষক বলেন, “এবার বীজ, সেচ, শ্রমিক—সব কিছুর দাম বেড়েছে। তার ওপর সার যদি বেশি দামে কিনতে হয়, তাহলে পেঁয়াজ চাষ করে লাভ তো দূরের কথা, খরচ ওঠানোই কঠিন হবে।” তাঁর ভাষায়, অনেক কৃষক ইতোমধ্যে ধারদেনা করে আবাদ করেছেন। ফলন কম হলে সেই ঋণের বোঝা তাদের আরও চাপে ফেলবে।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে সার মজুত থাকার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তা ঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, ডিলারদের কাছে গেলেই বলা হচ্ছে, “আজ সার নেই, কাল আসেন।” কিন্তু খোলা বাজারে বা পরিচিত মাধ্যমে বাড়তি দামে সার ঠিকই মিলছে। এতে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তারা মনে করছেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি মহল লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে।
এ অবস্থায় চাষিরা সরকারের কাছে বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ডিলারদের মাধ্যমে যেন সহজে এবং সরকার নির্ধারিত দামে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলছেন তারা, যাতে কোনো ডিলার বা ব্যবসায়ী অনিয়ম করতে না পারে।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, সার সংকটের বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাইসুল ইসলাম জানান, কাগজে-কলমে এলাকায় যথেষ্ট পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, “কোনো ডিলার বা খুচরা ব্যবসায়ী যদি সারের বিষয়ে অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে জরিমানা কিংবা ডিলারশিপ বাতিলের প্রক্রিয়াও গ্রহণ করা হবে।”
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে এই বক্তব্যের ফারাক রয়েছে বলে মনে করছেন কৃষকেরা। তাদের ভাষায়, কাগজে মজুত থাকলেই হবে না, সার কৃষকের হাতে পৌঁছাতে হবে। তা না হলে ফসল বাঁচানো সম্ভব নয়। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন, কিন্তু দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। পুরো কুষ্টিয়া জেলাজুড়ে এই আবাদ আরও বিস্তৃত। স্থানীয় অর্থনীতিতে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। শুধু কৃষকের আয় নয়, এই অঞ্চলের শ্রমিক, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাও পেঁয়াজ উৎপাদনের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে এই ফসলে বিপর্যয় হলে তার প্রভাব পড়বে পুরো অঞ্চলে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পেঁয়াজ এমন একটি কৃষিপণ্য, যার সরবরাহে সামান্য ঘাটতি হলেই বাজারে বড় প্রভাব পড়ে। দেশজুড়ে পেঁয়াজের দাম বাড়া বা কমার পেছনে উৎপাদনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কুষ্টিয়ার মতো বড় উৎপাদন এলাকাগুলোতে যদি ফলন কমে যায়, তাহলে তার প্রভাব জাতীয় বাজারেও পড়তে পারে। এতে ভোক্তাদেরও বাড়তি দাম গুনতে হতে পারে।
চাষিদের মতে, এখনো সময় আছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার। দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পেঁয়াজের জমি অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চান। সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, নিয়মিত তদারকি এবং কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছানো—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই সংকট অনেকটাই কাটবে বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে কুষ্টিয়ার পেঁয়াজের মাঠ এখন দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে সবুজ ফসলের আশা, অন্যদিকে সার সংকটের শঙ্কা। সময়মতো সমাধান না এলে এই সংকট শুধু কৃষকের নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কৃষকের চোখ এখন সরকারের দিকে—দ্রুত সিদ্ধান্ত আর কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই অনিশ্চয়তা দূর করতে।