শেরপুরে জামায়াত নেতাকে ইট দিয়ে থেঁতলে হত্যার অভিযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৪ বার
শেরপুরে জামায়াত নেতাকে ইট দিয়ে থেঁতলে হত্যার অভিযোগ

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শেরপুরে নির্বাচনী পরিবেশকে ঘিরে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জেলা জামায়াতে ইসলামী। দলটির জেলা আমির হাফিজুর রহমান এই ঘটনার জন্য কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়ে দ্রুত মামলা দায়ের ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) সকালে গণমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার পাঠের মতো একটি প্রশাসনিক ও শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা চালিয়ে রেজাউল করিমকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “এটি শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং গণতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত। আমরা দ্রুত মামলা করব এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

নিহত মাওলানা রেজাউল করিম শ্রীবরদী উপজেলার গজরিপা ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করছিলেন। পাশাপাশি তিনি একটি মসজিদের ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। এলাকাবাসীর কাছে একজন ধর্মভীরু, শান্ত স্বভাবের ও সমাজসেবামূলক মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।

স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৬ জানুয়ারি) সকালে ঝিনাইগাতী উপজেলায় সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার উদ্যোগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে একটি নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হতে থাকেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল।

প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, মঞ্চে ওঠা ও সামনের সারিতে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে প্রথমে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে কথাকাটাকাটি থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই অনুষ্ঠানস্থল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। চেয়ার ভাঙচুর, মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় সভামঞ্চের সামনে থাকা কয়েক শ চেয়ার ভেঙে ফেলা হয় এবং বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন বা ভাঙচুর চালানো হয়। এতে বিএনপি ও জামায়াতের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। আহতদের মধ্যে ছিলেন জামায়াত নেতা রেজাউল করিমও। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে শেরপুর সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

শেরপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রেজাউল করিমের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ময়মনসিংহে নেওয়ার পথে রাত সাড়ে নয়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

শেরপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক উপল হাসান জানিয়েছেন, রেজাউল করিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া জরুরি। ময়নাতদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে তিনি জানান।

ঘটনার পর সন্ধ্যায় ঝিনাইগাতী শহরে আবারও বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় দলের আরও কয়েকজন আহত হন। জামায়াতের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এই সময় বিএনপির কয়েকজন কর্মী রেজাউল করিমকে ধরে এনে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রীবরদী উপজেলার গজরিপা ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল মান্নান বলেন, “বিএনপির নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর ধাওয়া দেয়। এ সময় রেজাউল করিমকে তারা ধরে ফেলে। এরপর তাঁকে ইট দিয়ে আঘাত করতে থাকে। আমরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ হয়ে ওঠে।”

বৃহস্পতিবার সকালে নিহত রেজাউল করিমের বাড়ি গজরিপা ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো গ্রামে। বাড়ির উঠানে কবর খোঁড়ার প্রস্তুতি চলছে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভানুধ্যায়ীরা ভিড় করছেন। সবাই অপেক্ষায় আছেন মরদেহের জন্য। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, “রেজাউল খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কখনো কাউকে কষ্ট দিয়েছেন বলে শুনিনি। এলাকায় তাঁর যথেষ্ট সম্মান ও জনপ্রিয়তা ছিল। এমন একজন মানুষের মৃত্যুতে আমরা স্তব্ধ। আমরা এর সঠিক বিচার চাই।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে এ ধরনের সহিংসতা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। প্রশাসনিক অনুষ্ঠানে সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির ঘটনা প্রমাণ করে যে, নির্বাচনী পরিবেশ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ ও সহনশীল হয়ে ওঠেনি। তারা বলছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।

এদিকে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে, শেরপুরে জামায়াত নেতা রেজাউল করিমের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তি হত্যার ঘটনা নয়, বরং নির্বাচনী রাজনীতিতে সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা না গেলে তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন সচেতন মহল

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত