প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট ও বাজার অস্থিরতার আশঙ্কায় কঠোর অবস্থানে গেল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কর্ণফুলী নদীতে লাইটারেজ জাহাজকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করে পণ্য মজুতের অভিযোগে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়, যা রমজানপূর্ব বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের কঠোর মনোভাবেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, রমজান উপলক্ষ্যে বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ইতোমধ্যে আমদানি হয়েছে বা বন্দরে আসার পথে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করে লাইটারেজ জাহাজে করে দ্রুত দেশের বিভিন্ন নদীবন্দর ও অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র পরিকল্পিতভাবে এই পণ্য বাজারে ছাড়ছে না। প্রশাসনের নজরদারি এড়াতে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা আদায়ের লক্ষ্যে তারা কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন নদীতে লাইটারেজ জাহাজেই পণ্য আটকে রাখছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কর্ণফুলী নদীতে অস্বাভাবিকভাবে অনেক লাইটারেজ জাহাজ দীর্ঘ সময় ধরে নোঙর করে থাকতে দেখা যায়। অনুসন্ধানে উঠে আসে, এসব জাহাজে রমজানের জন্য আমদানিকৃত চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেলসহ গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্য মজুত রাখা হয়েছে। কার্যত এসব জাহাজকে ভাসমান গুদামে পরিণত করা হয়েছে, যা সরাসরি বাজার ব্যবস্থার জন্য হুমকি।
এই পরিস্থিতির ফলে দ্বিমুখী সংকট সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ কমে গিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, বিশেষ করে রমজানের মতো সংবেদনশীল সময়ে, যখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ব্যয়চাপ এমনিতেই বেশি থাকে। অন্যদিকে লাইটারেজ জাহাজগুলো আটকে থাকায় মাদার ভেসেল থেকে সময়মতো পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিক সরবরাহ চেইনে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, সাধারণত একটি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে সাত থেকে আট দিনের বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু বর্তমানে কিছু জাহাজের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা বেড়ে দশ থেকে বিশ দিন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক মাস পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এর ফলে বন্দরে জাহাজের জট তৈরি হচ্ছে, ভাড়া ও ডেমারেজ চার্জ বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত এর নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।
এই প্রেক্ষাপটে কর্ণফুলী নদীতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে সন্দেহভাজন লাইটারেজ জাহাজগুলো শনাক্ত করা হয়। অভিযানে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করেন এবং কেন পণ্য খালাস ও পরিবহন বিলম্বিত হচ্ছে, সে বিষয়ে জাহাজ মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাখ্যা চান। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল অবৈধ মজুত ঠেকানো, পণ্য দ্রুত বাজারে ছাড়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং রমজানে সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখা।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন, “রমজান সামনে রেখে কেউ যেন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য আমরা আগেই সতর্ক অবস্থানে ছিলাম। অভিযানের মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই—বন্দর বা নদীপথকে কোনোভাবেই অবৈধ মজুতের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।”
অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা এই অভিযানকে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, রমজানের আগে নিত্যপণ্যের বাজার সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল থাকে। এই সময় সামান্য সরবরাহ সংকটও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। তাই সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
চট্টগ্রামের একজন পাইকারি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা যারা নিয়ম মেনে কাজ করি, তাদের জন্য এই ধরনের অসাধু কার্যক্রম বড় সমস্যা তৈরি করে। পণ্য সময়মতো বাজারে না এলে দাম বাড়ে, আর সেই দায় শেষ পর্যন্ত আমাদের ওপরই পড়ে। অভিযান হলে অন্তত এই অসাধু চক্রগুলো কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
অভিযানকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী নদীতে কর্মরত নৌ-শ্রমিকদের মাঝেও স্বস্তি দেখা গেছে। অনেক নৌ-শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন জাহাজ আটকে থাকলে তাদের কাজ কমে যায়, আয় কমে যায়। নিয়মিত পণ্য খালাস হলে তাদের জীবন-জীবিকাও স্বাভাবিক থাকে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অভিযান কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়। রমজান পর্যন্ত এবং প্রয়োজনে তার পরেও নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং অবৈধ মজুতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই ধরনের অভিযান শুধু কর্ণফুলী নদীতে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ ও নৌবন্দরেও চালানো প্রয়োজন। কারণ, আমদানিকৃত পণ্যের বড় একটি অংশ নদীপথে পরিবহন হয় এবং এখানেই অসাধু চক্রগুলো সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।
সব মিলিয়ে, কর্ণফুলীতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এই অভিযান রমজানপূর্ব বাজার ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি সমন্বিতভাবে নজরদারি অব্যাহত রাখে, তবে কৃত্রিম সংকট রোধ করা সম্ভব হবে এবং সাধারণ মানুষ ন্যায্য দামে নিত্যপণ্য পাওয়ার আশা করতে পারবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সচেতন মহল।