অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে শূন্যতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৯ বার
অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে শূন্যতা

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের সবচেয়ে ধনী ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য মহারাষ্ট্র হঠাৎ করেই এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রভাবশালী রাজনীতিক ও রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি মহারাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। বুধবার সকালে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় অজিত পাওয়ারসহ আরও চারজনের প্রাণহানির ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনকে কার্যত স্তব্ধ করে দিয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারের অংশ হিসেবে মুম্বাই থেকে পুনে জেলার বারামতীর উদ্দেশে যাত্রা করেছিল ভাড়া করা ছোট বিমানটি। ভিটিএসএসকে নম্বরের লিয়ারজেট ৪৫ মডেলের এই বিমানটি সকাল পৌনে ৯টার দিকে অবতরণের সময় রানওয়ের পাশে বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনার পরপরই বিমানে আগুন ধরে যায়, আর মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই অজিত পাওয়ার, পাইলট এবং তার নিরাপত্তাকর্মীসহ মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মহারাষ্ট্রজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিশ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন এবং অজিত পাওয়ারকে “একজন সাহসী ও প্রভাবশালী নেতা” হিসেবে স্মরণ করেন।

অজিত পাওয়ারের রাজনৈতিক জীবন ছিল যেমন দ্রুত উত্থানের গল্প, তেমনি তা ছিল দ্বন্দ্ব, ভাঙন ও বিতর্কে ভরা। তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শরদ পাওয়ারের ভাইয়ের ছেলে। সেই পরিচয় তাকে রাজনীতিতে প্রবেশের দরজা খুলে দিলেও, আজীবন তাকে লড়াই করতে হয়েছে কাকার বিশাল ছায়ার সঙ্গে। শরদ পাওয়ার ছিলেন জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, জোট রাজনীতির একজন কিংবদন্তি কৌশলী এবং দিল্লি থেকে মুম্বাই—সবখানেই যাঁর প্রভাব বিস্তৃত। অন্যদিকে, অজিত পাওয়ার ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন একজন বাস্তববাদী, মাঠের রাজনীতির নেতা হিসেবে।

১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া অজিত পাওয়ার ১৯৮০-এর দশকে রাজনীতিতে পা রাখেন। পশ্চিম মহারাষ্ট্রের বারামতী ছিল তাঁর রাজনৈতিক ঘাঁটি। এই অঞ্চলে চিনি সমবায়, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, স্থানীয় ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব মিলিয়ে পাওয়ার পরিবারের প্রভাব ছিল গভীর। ছোটবেলা থেকেই অজিতকে অনেকেই দেখতেন কাকার উত্তরাধিকারী হিসেবে। কিন্তু তিনি কখনোই শুধু উত্তরাধিকার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ক্ষমতার বাস্তব নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনের ওপর প্রভাব এবং স্থানীয় নেটওয়ার্ককে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে।

রাজনৈতিক স্টাইলেও কাকা-ভাগ্নের পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। শরদ পাওয়ার ছিলেন ধীরস্থির, মেপে কথা বলা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের রাজনীতিক। অজিত পাওয়ার ছিলেন সরাসরি, কখনো কখনো রূঢ়, কিন্তু বাস্তবমুখী। এই বৈশিষ্ট্য তাকে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনি সমালোচনার মুখেও ফেলেছে। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘ডিসিশন মেকার’, আর সমালোচকদের চোখে ক্ষমতালোভী ও সুবিধাবাদী নেতা। এনসিপির ভেতরে দ্রুত উত্থান ঘটলেও, দীর্ঘদিন তাকে কেবল শরদ পাওয়ারের ছায়া হিসেবেই দেখা হয়েছে। বড় সিদ্ধান্তে শেষ কথা বলতেন কাকাই—এমন ধারণা অজিত পাওয়ারের ভেতরে এক ধরনের হতাশা জন্ম দিয়েছিল।

এই হতাশাই একসময় প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়। ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় নেয় অজিত পাওয়ারের সিদ্ধান্তে। হঠাৎ করেই তিনি কাকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করেন এবং উপমুখ্যমন্ত্রীর শপথ নেন। এই ঘটনা গোটা দেশকে চমকে দিয়েছিল। তবে সেই সরকার টিকেছিল মাত্র কয়েক দিন। শরদ পাওয়ার দ্রুত হস্তক্ষেপ করে দলের নিয়ন্ত্রণ ফেরত নেন এবং নতুন জোট সরকার গঠন করেন। অজিত পাওয়ার আবার এনসিপিতে ফিরে এলেও, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ফাটল তখন আর গোপন থাকেনি।

চার বছর পর, ২০২৩ সালে, সেই ফাটল আরও গভীর হয়। অজিত পাওয়ার এবার পুরোপুরি এনসিপি ছেড়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন। এইবার তিনি শুধু উপমুখ্যমন্ত্রীই হননি, বরং এনসিপিকে কার্যত বিভক্ত করে দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিজের গোষ্ঠীর দখলে আনেন। পাওয়ার পরিবার, যা একসময় মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে ঐক্যের প্রতীক ছিল, তা স্পষ্টভাবে দুই শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। চাচা ও ভাগ্নে একে অপরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন, আর ব্যক্তিগত সম্পর্কও দূরে সরে যায়।

এই সিদ্ধান্তকে সমর্থকরা দেখেছিলেন সাহসী ও বাস্তববাদী পদক্ষেপ হিসেবে। তাদের মতে, ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতায় যেতে হলে আদর্শিক সীমারেখা ভাঙতেই হয়, আর অজিত পাওয়ার সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সমালোচকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রতীক, যিনি ক্ষমতার জন্য যে কোনো জোটে যেতে প্রস্তুত। এই বিভাজন মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেয় এবং রাজ্যের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুনে ও মুম্বাইয়ের নাগরিক নির্বাচনের পর আবার আলোচনা শুরু হয়েছিল—চাচা ও ভাগ্নের নেতৃত্বাধীন এনসিপির দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কি পুনর্মিলন সম্ভব? রাজনৈতিক মহলের একাংশ ধারণা করছিল, ঐক্য হলে অজিত পাওয়ারই হতে পারেন সমন্বয়কারী নেতা। কিন্তু তার আকস্মিক মৃত্যু সেই সব সম্ভাবনাকে এক ঝটকায় থামিয়ে দিয়েছে।

এখন মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে বড় প্রশ্নগুলো সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অজিত পাওয়ারের সঙ্গে থাকা বিধায়ক ও নেতারা কার নেতৃত্বে যাবেন? তারা কি শরদ পাওয়ারের কন্যা সুপ্রিয়া সুলের নেতৃত্ব মেনে নেবেন, নাকি অজিত পাওয়ারের পরিবার থেকেই কেউ সামনে আসবেন? আর তিনি যে ভঙ্গুর জোট তৈরি করেছিলেন, সেটি আদৌ টিকে থাকবে কি না—সেই প্রশ্নও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

একটি বিষয় নিশ্চিত—অজিত পাওয়ারের মৃত্যু মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে শুধু একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং একটি নতুন অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা। ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্যে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে সময় লাগবে, আর সেই পথ যে সহজ হবে না, তা বলাই বাহুল্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত