প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনীতিতে নতুন করে আগুনে ঘি ঢেলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলার ইঙ্গিতের জবাবে ইরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে—তারা শুধু প্রস্তুতই নয়, বরং জোরালো ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জন্য সেনাবাহিনীর ‘আঙুল ট্রিগারে’ রাখা আছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির এই বক্তব্য নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে যে, দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন যেকোনো সময় সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
তেহরানে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মন্তব্য করেন, “সংঘাত এড়ানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।” এই বক্তব্যকে কেবল কূটনৈতিক চাপ নয়, বরং সামরিক হুমকির স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছে তেহরান। এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আব্বাস আরাগচি জানান, ইরান যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং সেই জবাব হবে কঠোর। তার ভাষায়, ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং প্রয়োজনে শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে দ্বিধা করবে না।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে এই কঠোরতার সুর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উপদেষ্টা আলি শামখানি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “সীমিত হামলা বলে কিছু নেই—এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। আমেরিকার যেকোনো সামরিক পদক্ষেপকে আমরা যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করব।” তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এমন পরিস্থিতিতে ইরানের জবাব হবে তাৎক্ষণিক, সর্বাত্মক এবং নজিরবিহীন। শামখানির ভাষায়, সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের লক্ষ্য হতে পারে তেল আবিবের কেন্দ্রস্থল এবং আগ্রাসনকারীর সব সহযোগী শক্তি। এই বক্তব্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইসরাইল ও তার মিত্রদের প্রতিও একটি সরাসরি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা ও মন্তব্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুদিন আগে সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি “বিশাল আর্মাডা” ইরানের উপকূলবর্তী অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রয়োজনে এই নৌবহর দ্রুত এবং সহিংসভাবে তাদের মিশন সম্পন্ন করতে সক্ষম। ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি প্রদর্শনের স্পষ্ট বার্তা বহন করে, যা তেহরানের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে কেবল সামরিক প্রস্তুতির কথাই বলেননি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আব্বাস আরাগচি তার পোস্টে আলোচনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান সবসময় পারস্পরিক লাভ ও সমতার ভিত্তিতে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে সেই চুক্তিতে কোনো ধরনের ভয়ভীতি, চাপ বা হুমকি থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। আরাগচির মতে, ইরান এমন একটি সমঝোতা চায়, যা একদিকে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করবে এবং অন্যদিকে অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ রাখবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তেহরান আবারও বোঝাতে চেয়েছে, তারা আলোচনার টেবিলে ফিরতে প্রস্তুত—কিন্তু তা হবে সম্মানের ভিত্তিতে, চাপের মুখে নয়।
পারমাণবিক ইস্যু বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, “ইরানের নিরাপত্তা ভাবনায় পারমাণবিক অস্ত্রের কোনো স্থান নেই। আমরা কখনোই সেগুলো অর্জনের চেষ্টা করিনি।” ইরান বহুবার দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল গবেষণা ও বেসামরিক জ্বালানি উৎপাদনের জন্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ এই দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। তাদের আশঙ্কা, বেসামরিক কর্মসূচির আড়ালেই ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইউরোপের অবস্থানও ধীরে ধীরে কঠোর হচ্ছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস মন্তব্য করেছেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের পর ইরানের দিন শেষের পথে। তার এই মন্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগের প্রতিফলন। একই সুরে ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আহ্বান জানিয়েছে, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসকে—যা আইআরজিসি নামে পরিচিত—সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হোক।
আইআরজিসি ইরানের আদর্শিক ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে পরিচিত, যার প্রভাব শুধু দেশের ভেতরেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতেও বিস্তৃত। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এই বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য এখনো সে পথে পুরোপুরি হাঁটেনি। যদিও সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ইউরোপের অবস্থানকে আরও কঠোর করে তুলছে।
একটি মানবাধিকার সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ছয় হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং তেহরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো মনে করছে, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ ইরানকে দুর্বল করছে। কিন্তু তেহরান এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে বলছে, চাপ যত বাড়বে, প্রতিরোধও তত শক্ত হবে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই উত্তেজনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল বোঝাবুঝি বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। একদিকে সামরিক হুমকি ও শক্তি প্রদর্শন, অন্যদিকে আলোচনার দরজা আংশিক খোলা রাখার কূটনৈতিক বার্তা—এই দ্বিমুখী কৌশল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সংযম ও কূটনৈতিক উদ্যোগই পারে একটি বড় যুদ্ধ এড়াতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়, আর সেই অনড় অবস্থানের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।