৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে বৈধতার পথে আনছে স্পেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১২ বার
৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে বৈধতার পথে আনছে স্পেন

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু পশ্চিমা দেশ অভিবাসন নীতিকে আরও কঠোর করছে, সীমান্তে নজরদারি বাড়াচ্ছে এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় ইউরোপের অন্যতম দেশ স্পেন হাঁটছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। মানবিকতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক সংহতিকে সামনে রেখে স্পেন সরকার ঘোষণা দিয়েছে—দেশটিতে বসবাসরত অন্তত পাঁচ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে বৈধ হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তকে শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং স্পেনের অভিবাসন নীতিতে একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্পেন সরকারের এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাস করলেও কাগজপত্রের অভাবে যারা অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন, তাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা। সরকার জানিয়েছে, যেসব বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ নেই, তারাই এই বৈধতার সুযোগ পাবেন। এজন্য আবেদনকারীদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরের আগেই কমপক্ষে পাঁচ মাস ধরে স্পেনে বসবাস করছেন। এই শর্তের মাধ্যমে সরকার একদিকে যেমন নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে তেমনি প্রকৃতভাবে সমাজের সঙ্গে যুক্ত অভিবাসীদের আইনি স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে।

স্পেনের সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী এলমা সাইজ এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে গিয়ে একে “স্পেনের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন” বলে আখ্যায়িত করেন। তার ভাষায়, এই পদক্ষেপ শুধু অভিবাসীদের জীবন বদলাবে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকেও আরও শক্তিশালী করবে। বৈধকরণের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য বসবাসের অনুমতি দেওয়া হবে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এই মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। আগামী এপ্রিল মাস থেকে এই বৈধকরণ প্রক্রিয়ার জন্য আবেদন নেওয়া শুরু হবে এবং জুন মাস পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ চলবে।

এলমা সাইজ আরও বলেন, স্পেন এমন একটি অভিবাসন মডেল অনুসরণ করতে চায়, যা মানবাধিকার, সমন্বয় ও সহাবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। তার মতে, অভিবাসনকে শুধুই নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে না দেখে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সংহতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। স্পেন সরকার বিশ্বাস করে, নিয়মিত কাঠামোর মধ্যে অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করলে তারা করব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনে অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা থেকে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। কলম্বিয়া, পেরু ও হন্ডুরাস—এই তিন দেশ থেকে আসা নাগরিকরাই বর্তমানে স্পেনে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের বড় একটি অংশ। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যের কারণে স্পেন বরাবরই লাতিন আমেরিকার মানুষের কাছে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

চিন্তক প্রতিষ্ঠান ফাঙ্কাসের পরিসংখ্যান এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। ২০১৭ সালে স্পেনে নথিপত্রহীন অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৪০৯ জন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা প্রায় আট গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ জনে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের একটি বড় অংশই কর্মক্ষেত্রে যুক্ত থাকলেও আইনি স্বীকৃতি না থাকায় তারা নানা ধরনের শোষণ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন।

স্পেনের সোশ্যালিস্ট নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ইউরোপের অনেক বড় অর্থনীতির দেশের তুলনায় অভিবাসন প্রশ্নে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। যেখানে অনেক দেশ অভিবাসীদের সংখ্যা কমানোর দিকে জোর দিচ্ছে, সেখানে স্পেন তাদের অর্থনীতিতে অভিবাসীদের অবদানকে গুরুত্ব দিচ্ছে। নির্মাণ, কৃষি, পর্যটন, সেবা খাত—এই সব খাতেই অভিবাসীরা স্পেনের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন।

এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পেছনে স্পেনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেন তুলনামূলকভাবে ভালো করছে। ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ইউরোপের অনেক দেশের জন্যই ঈর্ষণীয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রমবাজারে অভিবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দীর্ঘদিন ধরে স্পেনের অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা ছিল উচ্চ বেকারত্বের হার। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে দেশটিতে বেকারত্ব কখনোই স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যানুসারে, বহু বছর পর প্রথমবারের মতো স্পেনে বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমেছে। সরকারের মতে, বৈধ অভিবাসীরা শ্রমবাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলে এই ইতিবাচক ধারা আরও জোরদার হবে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও নেই এমন নয়। ডানপন্থী কিছু রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, ব্যাপক বৈধকরণ ভবিষ্যতে আরও অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে পারে। তাদের মতে, এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। তবে সরকার এই আশঙ্কা নাকচ করে বলছে, এই পদক্ষেপ এককালীন ও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ, যা অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত করবে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্পেন সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, আইনি স্বীকৃতি পেলে অভিবাসীরা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার সহজে পাবেন। একই সঙ্গে শ্রমবাজারে তাদের ওপর যে শোষণ চলে আসছিল, তা অনেকাংশে কমবে। বিশেষ করে নারী ও শিশু অভিবাসীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত একটি বড় স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে স্পেনের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের অভিবাসন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। যখন বিশ্বজুড়ে অভিবাসন ইস্যু রাজনৈতিক বিভাজনের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে, তখন স্পেন মানবিকতা ও বাস্তবতার সমন্বয়ে একটি বিকল্প পথ দেখানোর চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগ সফল হলে তা শুধু পাঁচ লাখ মানুষের জীবনই বদলাবে না, বরং ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নীতির আলোচনাকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত