পঞ্চগড়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল রাজপথ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৫ বার
পঞ্চগড়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল রাজপথ

প্রকাশ: ২৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পঞ্চগড়ে নির্বাচন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে নেমেছে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। বুধবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, যা জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বুধবার বিকেল পাঁচটার দিকে পঞ্চগড় জেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিলের সূচনা হয়। ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ব্যানারে আয়োজিত এই মিছিলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের নেতা–কর্মীরা অংশ নেন। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে সোয়া পাঁচটার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে পৌঁছে বিক্ষোভকারীরা মাটিতে বসে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।

বিক্ষোভ চলাকালে জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা–কর্মীরা বক্তব্য দেন। তাঁদের বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা থাকলেও পঞ্চগড়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পায়। বক্তারা অভিযোগ করেন, নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে, যা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ, ১১–দলীয় জোটের প্রার্থীর ফেস্টুন ও ব্যানার প্রশাসনের নির্দেশে অপসারণ করা হলেও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ করা হয়নি। বিশেষ করে পঞ্চগড়-১ আসন, যার আওতায় পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলা রয়েছে, সেখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নওশাদ জমিরের বিভিন্ন ফেস্টুন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। বিক্ষোভকারীরা বলেন, এসব ফেস্টুন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকলেও প্রশাসন সেগুলো অপসারণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এতে স্পষ্টভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে বিক্ষোভকারীরা সন্ধ্যার পরও অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান। মাগরিব ও এশার নামাজ তাঁরা সেখানেই আদায় করেন, যা কর্মসূচির দৃঢ়তা ও শান্তিপূর্ণ চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। সন্ধ্যা ৭টা ৬ মিনিটে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেন পঞ্চগড়-১ আসনের ১১–দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী ও এনসিপি নেতা সারজিস আলম এবং জামায়াতে ইসলামী পঞ্চগড় জেলা শাখার আমির ইকবাল হোসাইন। তাঁরা কিছু সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে অবস্থান করেন এবং আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে পরে সেখান থেকে চলে যান।

বিক্ষোভ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কিছুটা দূরত্বে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নিলেও প্রশাসনের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলতে বা বাইরে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়নি। এতে একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে এবং তাঁরা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মো. সায়েমুজ্জামানের পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

রাত সোয়া ১০টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর পঞ্চগড় শহর শাখার সেক্রেটারি নাসির উদ্দীন সরকার বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ১১–দলীয় জোট রিটার্নিং কর্মকর্তার পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবি নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ১২ ঘণ্টা সময় চেয়েছে। এ কারণে আগামী বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে আবারও অবস্থান কর্মসূচি শুরু হবে।

এই ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে রাত সোয়া আটটার দিকে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মো. সায়েমুজ্জামান মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে জানান, বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর যেসব ব্যানার ও ফেস্টুন গাছ কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ছিল, সেগুলো ইতোমধ্যেই অপসারণ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিক্ষোভকারীরা যেগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন, সেগুলো নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করার পর কমিশন থেকে জানানো হয়েছে যে সেগুলো ফেস্টুন নয়, বরং ব্যানার। তাঁর ভাষায়, ব্যানার বৈধ হওয়ায় সেগুলো অপসারণের প্রয়োজন নেই।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি ইতোমধ্যেই এনসিপির প্রার্থী সারজিস আলম এবং জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ইকবাল হোসাইনকে জানানো হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নে প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রয়েছে এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।

তবে বিক্ষোভকারীরা জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের দাবি, ব্যানার ও ফেস্টুনের পার্থক্য দেখিয়ে প্রশাসন মূল প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে। তাঁদের মতে, নির্বাচনী প্রচারে সমান সুযোগ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই ধরনের আচরণ অব্যাহত থাকলে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পঞ্চগড়ের এই বিক্ষোভ দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় চলমান আস্থার সংকটেরই প্রতিফলন। নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনের ভূমিকা বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়। এক পক্ষ যদি মনে করে প্রশাসন নিরপেক্ষ নয়, তাহলে সেই অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা জরুরি। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও স্বচ্ছতা ও নিয়মের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, পঞ্চগড়ে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এই আন্দোলন শুধু একটি জেলার ঘটনা নয়, বরং জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। এখন সবার দৃষ্টি নির্বাচন কমিশনের দিকে—তারা কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং কীভাবে এই অভিযোগের নিষ্পত্তি করে, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত