ইরানে হামলা হলে অনিশ্চয়তায় ডুববে মধ্যপ্রাচ্য: চীনের সতর্কবার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৬ বার
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে কী হবে, মুখ খুললো চীন

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার পথে এগোয়, তাহলে গোটা অঞ্চল ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হবে—এমন স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে চীন। জাতিসংঘে বেইজিংয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি ফু কং বলেছেন, শক্তি প্রয়োগ করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় এবং যেকোনো ধরনের সামরিক দুঃসাহসিকতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ইরানকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা। ফিলিস্তিন ইস্যু, গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য যেন এক বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত বিতর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফু কং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না; বরং তা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, মানবিক বিপর্যয় ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে।

চীনের এই কূটনৈতিক বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পশ্চিমা গণমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছে। অন্যদিকে ইরান বরাবরের মতোই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলে আসছে।

ফু কং তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। তার ভাষায়, যেকোনো সামরিক দুঃসাহসিকতা অঞ্চলটিকে অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে ঠেলে দেবে, যার ফল শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সূচনা করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে পরোক্ষ বার্তা দিয়ে চীনের এই কূটনীতিক বলেন, বেইজিং আশা করে ওয়াশিংটন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর আহ্বানে সাড়া দেবে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি এবং উত্তেজনা বাড়ায়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে সব পক্ষের বিরত থাকা উচিত।

ইরান প্রসঙ্গে ফু কং জোর দিয়ে বলেন, দেশটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সে দেশের জনগণের মাধ্যমেই স্বাধীনভাবে নির্ধারিত হওয়া উচিত। চীন ইরানে স্থিতিশীলতা দেখতে চায় এবং তা সমর্থন করে বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, বেইজিং দেশটির সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষেও অবিচল অবস্থানে রয়েছে।

তার বক্তব্যে জাতিসংঘ সনদের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। ফু কং বলেন, চীন সব পক্ষকে জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিমালা মেনে চলার আহ্বান জানায়। তিনি অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকিকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে চীন মূলত বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে মধ্যপ্রাচ্য কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান হওয়া উচিত নয়। ফু কং বলেন, এই অঞ্চলকে বাইরের দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার শিকার বানানো হলে তার ফল হবে ভয়াবহ। এতে শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাই নয়, সাধারণ মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও মানবাধিকারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যার সমাধান আসতে হবে সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও চীনের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে এবং পুরো অঞ্চল জুড়ে মানবিক সংকট গভীরতর হয়েছে। চীন মনে করে, নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

ফু কং আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যৌথভাবে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমাধান, কূটনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে এগোলেই কেবল দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সম্ভব। সংঘাত নয়, বরং সহযোগিতাই হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে চীনের এই বক্তব্য শুধু একটি কূটনৈতিক অবস্থান নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলবে—এ বিষয়ে চীন যে উদ্বিগ্ন, তার প্রতিফলনই এই বক্তব্য।

সব মিলিয়ে চীনের সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি রক্ষা করা এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক দায়িত্ব। শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং সংযম, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব—এমন বার্তাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে বেইজিংয়ের অবস্থান থেকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত