ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারাই হবেন ব্যাংকের মালিক: নতুন অধ্যাদেশ জারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৬ বার
ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারাই হবেন ব্যাংকের মালিক: নতুন অধ্যাদেশ জারি

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টাকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে সুসংহত কাঠামোর আওতায় এনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার জারি করেছে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’। এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এখন থেকে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারাই শুধু ঋণ নেওয়া গ্রাহক হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবেন না; বরং সরাসরি ব্যাংকের মালিকানায় অংশীদার হবেন।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ থেকে গত বুধবার এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই অধ্যাদেশ দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলে মনে করছেন অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা।

নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, দেশে ৫০০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনে একটি বিশেষায়িত ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই ব্যাংকের মালিকানার অন্তত ৬০ শতাংশ থাকবে সাধারণ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের হাতে। অর্থাৎ যারা এতদিন কেবল ঋণ নিয়ে জীবন ও জীবিকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তারাই এবার ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মালিকানা কাঠামোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পাবে।

অধ্যাদেশে এই ব্যাংককে একটি ‘সামাজিক ব্যবসায়’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, এটি প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো কেবল মুনাফা অর্জনের জন্য পরিচালিত হবে না। এখানে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল বিনিয়োগের অতিরিক্ত কোনো লভ্যাংশ পাবেন না। বরং ব্যাংকের অর্জিত নিট মুনাফা পুনরায় সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনমূলক খাতে ব্যয় করতে হবে। তবে সাধারণ ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে এই বিধান কিছুটা শিথিল রাখা হয়েছে, যাতে তারা বিনিয়োগের সুফল পেতে পারেন।

ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও মূলধন কাঠামো সম্পর্কেও অধ্যাদেশে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার জন্য এই মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যাবে। ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা এবং প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধন থাকতে হবে ন্যূনতম ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ মূলধন সংগ্রহ করতে হবে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে। এ ছাড়া এই ব্যাংক কোনোভাবেই দেশের স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না, যাতে এটি পুরোপুরি সামাজিক উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়।

পরিচালনা পর্ষদের কাঠামোতেও নতুনত্ব আনা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড হবে মোট ৯ সদস্যের। এর মধ্যে ৪ জন পরিচালক নির্বাচিত হবেন ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে, যা তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি ৩ জন মনোনীত পরিচালক, ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং ভোটাধিকারবিহীন একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকারবলে বোর্ডে থাকবেন। কোনো পরিচালক একাদিক্রমে দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না—এ বিধানের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন রোধের চেষ্টা করা হয়েছে।

অধ্যাদেশে ব্যাংকের প্রধান কার্যাবলীর ক্ষেত্রেও বিস্তৃত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ব্যাংক নতুন উদ্যোক্তাদের আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ঋণ প্রদান করবে। পাশাপাশি আমানত গ্রহণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোগ মূলধন সরবরাহ, বিনা ফিতে কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান এবং শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য, গবাদিপশু ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঋণ সহায়তা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে।

ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে মানবিকতা ও সামাজিক সংবেদনশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিও অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ‘অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩’ অনুসরণ করার সুযোগ থাকলেও কোনো প্রকার জবরদস্তি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অবমাননাকর পদ্ধতি অবলম্বনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এতে করে ক্ষুদ্রঋণ খাতে দীর্ঘদিনের অভিযোগ—ঋণ আদায়ে অমানবিক আচরণ—হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন করবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা বোর্ড বাতিল করা, চেয়ারম্যান বা কোনো পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতাও রাখবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সব কার্যক্রম ‘ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১’ এবং ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি আইন, ২০০৬’-এর সংশ্লিষ্ট বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অধ্যাদেশ বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে ঘিরে উচ্চ সুদ, ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, তা অনেকাংশে কমে আসতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, ঋণগ্রহীতাদের মালিকানা নিশ্চিত হওয়ায় তারা আর কেবল সুবিধাভোগী নয়, বরং অংশীদার হিসেবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারবেন।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এর কার্যকর তারিখ নির্ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই নতুন মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি কার্যকর মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

সংবাদটি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত তথ্য, আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসন্ধান এবং অনলাইন তথ্য-উপাত্ত পর্যবেক্ষণ করে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত