মোসাদের গুপ্তচর অভিযোগে ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৯ বার
ইরানে মোসাদ গুপ্তচরের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইরানে একজন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের দুই চরম প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইরানের বিচার বিভাগ-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ‘মিজান’-এর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বুধবার (২৮ জানুয়ারি) হামিদরেজা সাবেত ইসমাইলিপুর নামের এক ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি শত্রু রাষ্ট্র ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি এবং গোয়েন্দা সহযোগিতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন।

মিজানের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামিদরেজাকে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, গোপন তথ্য ও নথি সংগ্রহ এবং তা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে হস্তান্তরের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। পরবর্তীতে ইরানের সর্বোচ্চ আদালত সেই রায় বহাল রাখে। সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই বুধবার দণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানিয়েছে দেশটির বিচার বিভাগ।

ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। বিশেষ করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখাই ইরানের নীতি। দেশটির বিচার বিভাগের এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, হামিদরেজা সাবেত ইসমাইলিপুর ‘সংবেদনশীল ও গোপন নথি’ সংগ্রহ করে শত্রু রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছিল।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গত বছর জুন মাসে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের পর থেকে এই প্রবণতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশটির অভ্যন্তরে নাশকতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার চেষ্টা করছে, আর সেই কারণেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।

ইরান-ইসরাইল সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরিতার মধ্যে রয়েছে। তেহরান প্রকাশ্যেই ইসরাইলের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আসছে এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শত্রুতার পরিবেশে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নতুন নয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রায়ই এসব ঘটনার স্বচ্ছতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বরাবরই ইরানে মৃত্যুদণ্ডের উচ্চহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিযোগে অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়, যেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সীমিত থাকে। যদিও ইরান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলে আসছে যে, তাদের বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয় এবং প্রতিটি মামলায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

এই সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কিছু পশ্চিমা দেশ ও মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এটিকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করে মন্তব্য করতে বিরত রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে উত্তাপ যোগ করছে এবং ভবিষ্যতে ইরান-ইসরাইল সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে হামিদরেজা সাবেত ইসমাইলিপুরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ইরানের কঠোর নিরাপত্তা নীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং চলমান আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনেরই একটি প্রতিফলন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত