বায়ুদূষণে শীর্ষে তাসখন্দ, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ঢাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৩ বার
বায়ুদূষণে শীর্ষে তাসখন্দ, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ঢাকা

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ এমন বাতাসে শ্বাস নিচ্ছেন, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। শুক্রবার সকালে প্রকাশিত বৈশ্বিক বায়ুগুণমান সূচক সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্বের ১২৫টি দেশের শহরের মধ্যে বায়ুদূষণে আজ শীর্ষে উঠে এসেছে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ। একই তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে, যা দেশের নগরজীবনের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তাসখন্দের বায়ুগুণমান সূচক বা একিউআই স্কোর দাঁড়ায় ২৫৫। এই মাত্রা আইকিউএয়ারের মানদণ্ডে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ এই শহরের বাতাসে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে সুস্থ মানুষেরও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, আর শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসযন্ত্রের রোগীদের জন্য তা মারাত্মক হতে পারে।

তাসখন্দের পরই তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল। শহরটির বায়ুগুণমান সূচক স্কোর ২৩১, যা একইভাবে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে কাবুলের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। ২২২ স্কোর নিয়ে দিল্লির বাতাসও আজ ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবছর শীত মৌসুম এলেই দিল্লির দূষিত বাতাস আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা এবং কৃষিজ অবশিষ্ট পোড়ানোর ধোঁয়া—সব মিলিয়ে দিল্লির বায়ুদূষণ পরিস্থিতি বছরের পর বছর ধরেই উদ্বেগজনক।

এই তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে মিশরের রাজধানী কায়রো। ১৯৯ স্কোর নিয়ে শহরটির বাতাস বর্তমানে ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে রয়েছে। আর ঠিক এর পরেই পঞ্চম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, যার বায়ুগুণমান সূচক স্কোর ১৮৬। আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, এই মাত্রার বাতাসও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকার বাতাস আজ ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে থাকায় নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, হৃদরোগী ও অ্যাজমা রোগীদের জন্য এ ধরনের বাতাসে চলাফেরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছে। কখনো প্রথম, কখনো দ্বিতীয় কিংবা শীর্ষ পাঁচের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজধানীর নাম।

আইকিউএয়ারের বায়ুগুণমান সূচক অনুযায়ী, একিউআই স্কোর শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বাতাসকে ভালো বা স্বাস্থ্যকর ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ স্কোর হলে তা মাঝারি বা সহনীয় পর্যায়ে পড়ে। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোরকে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর বলা হয়, যেখানে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন হয়। ১৫১ থেকে ২০০ স্কোর হলে বাতাসকে অস্বাস্থ্যকর ধরা হয়, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোর হলে সেটিকে খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ৩০১-এর বেশি হলে পরিস্থিতি দুর্যোগপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

ঢাকার বর্তমান ১৮৬ স্কোর স্পষ্ট করে দিচ্ছে, নগরীর বাতাস স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য নিরাপদ নয়। পরিবেশবিদরা বলছেন, শীত মৌসুমে ঢাকার বায়ুদূষণ সাধারণত বেড়ে যায়। শুষ্ক আবহাওয়া, কম বৃষ্টিপাত এবং বাতাসে ধুলিকণার স্থায়িত্ব এ সময় দূষণকে আরও তীব্র করে তোলে। এর সঙ্গে যোগ হয় ইটভাটা, পুরোনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা ও শিল্পকারখানার নির্গমন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এমন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদ্‌রোগ এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ফুসফুসের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া গর্ভবতী নারীদের জন্যও দূষিত বাতাস মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বায়ুদূষণ কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত নীতি ও কঠোর বাস্তবায়ন। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন, পুরোনো ও ধোঁয়াচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটার আধুনিকায়ন, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ এবং নগর এলাকায় সবুজায়ন বাড়ানোর ওপর তারা জোর দিচ্ছেন। একই সঙ্গে নিয়মিত বায়ুগুণমান পর্যবেক্ষণ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বের অন্যান্য দূষিত শহরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মত অনেকের। নয়তো প্রতিবছরই শীত এলেই বায়ুদূষণের এই ভয়াবহ চিত্র নতুন করে সামনে আসবে এবং নগরবাসীকে তার মূল্য দিতে হবে স্বাস্থ্যঝুঁকির মাধ্যমে।

আজকের আইকিউএয়ারের তালিকা আবারও প্রমাণ করেছে, বায়ুদূষণ কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। ঢাকার বর্তমান অবস্থান সেই কঠিন বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করছে, যেখানে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ আরও শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত