চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে নতুন অধ্যায়, বৈশ্বিক কূটনীতিতে আলোড়ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬২ বার
চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে নতুন অধ্যায়, বৈশ্বিক কূটনীতিতে আলোড়ন

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির পালাবদলের এই সময়ে চীন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক, বাণিজ্য ও কৌশলগত নানা ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্যেই বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে লন্ডন। সাম্প্রতিক সফর ও ঘোষণাগুলো শুধু দুই দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যকেই নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতিক ভারসাম্যকেও নতুন আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের চীন সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ ছিল শুরু থেকেই। এই সফরেই আসে সবচেয়ে আলোচিত ঘোষণা—শিগগিরই যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই টানা ৩০ দিনের জন্য চীন ভ্রমণ করতে পারবেন। চীনের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও আস্থা বৃদ্ধির বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি পর্যটন, ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্য-চীন বিজনেস কাউন্সিল বৈঠকে এই সম্পর্কোন্নয়নের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়। বৈঠকে ৬০টি ব্রিটিশ ও ৫০টি চীনা প্রতিষ্ঠান সরাসরি অংশ নেয়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই পক্ষই খোলামেলা আলোচনা করে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় একমত হয়। বৈঠক শেষে জানানো হয়, আগামী কয়েক বছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিসর আরও সম্প্রসারিত করতে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই সফরে শুধু ভিসা সুবিধাই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। চীনের বাজারে ব্রিটিশ পণ্যের প্রবেশ সহজ করতে ব্রিটেনের হুইস্কির ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। স্কটিশ হুইস্কি শিল্পের জন্য এটি বড় স্বস্তির খবর। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্রিটিশ মদ শিল্প নতুন করে চীনা বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারবে এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকার ঘোষণা। প্রতিষ্ঠানটি চীনে প্রায় দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছে। এই বিনিয়োগ চীনের স্বাস্থ্যখাতে নতুন প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, পাশাপাশি ব্রিটিশ কোম্পানির জন্যও এটি দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক বাজার নিশ্চিত করবে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।

ডাউনিং স্ট্রিটের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য কার্যত ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলোর কাতারে শামিল হলো, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখার পথে এগিয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় চীনের মতো বড় অর্থনীতির সঙ্গে কাজ করা ছাড়া বিকল্প নেই।

এর আগে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সরাসরি আলোচনায় বসেন। বৈঠকের শুরুতেই শি জিনপিং স্পষ্ট করেন, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চীন প্রস্তুত। তিনি বলেন, বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য নিয়মিত সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও বৈঠকে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্য একটি স্বাধীন ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক দায়িত্ব—দুটোই সমান গুরুত্ব পায়।

তবে এই ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেছেন, চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ সুবিধা ও হুইস্কি শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্তকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখছেন। ট্রাম্পের এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিক্রিয়া আসলে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতারই প্রতিফলন। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতির প্রেক্ষাপটে বড় শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাজ্যের চীনের দিকে ঝোঁক অনেকের কাছেই বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ একে কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবেও দেখছেন।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুযোগ সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বস্তি। শিক্ষার্থী, পর্যটক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত ও যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ পাবেন। সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের এই নাটকীয় মোড় বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। একদিকে অর্থনৈতিক সুযোগ ও কূটনৈতিক সংলাপের প্রসার, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও জোট রাজনীতির টানাপোড়েন—এই দুই বাস্তবতার মাঝেই এগোতে হচ্ছে লন্ডনকে। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কতটা গভীর হয় এবং তা বৈশ্বিক রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত