সংসদে দুর্নীতিবাজদের ঠাঁই নয়, সংস্কারের অঙ্গীকার নাহিদের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৮ বার
সংসদে দুর্নীতিবাজদের ঠাঁই নয়, সংস্কারের অঙ্গীকার নাহিদের

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় রাজনীতিতে শুদ্ধতা ও জবাবদিহির প্রশ্নটি আবারও জোরালোভাবে সামনে আনলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ কিংবা কোনো অসৎ মানুষকে তিনি সংসদে দেখতে চান না। তার এই বক্তব্য শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নৈতিক অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে বনশ্রী এলাকার একটি জনসমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই এলাকা তার কাছে অপরিচিত নয়। তিনি এখানেই বড় হয়েছেন, এখানকার মানুষের জীবনযাপন, সমস্যা ও সম্ভাবনা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। সে কারণেই এই এলাকার মানুষের জন্য কাজ করার দায়বদ্ধতা তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন। তার ভাষায়, “আমি শুধু জাতীয় পর্যায়ের সংস্কার নয়, এই এলাকার সংস্কারও চাই। বনশ্রীকে একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন এলাকায় পরিণত করতে চাই।”

নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। তার মতে, হাসিনার শাসনামলে যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল—যেখানে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা—সেই রাজনীতি বাংলাদেশে আর চলতে পারে না এবং চলতেও দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ আর সেই পুরোনো রাজনীতি দেখতে চায় না। মানুষ চায় পরিষ্কার রাজনীতি, যেখানে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই—চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতির রাজনীতি আর চলবে না।” তার এই বক্তব্যে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া দেখা যায়।

জাতীয় নাগরিক পার্টির এই নেতা জানান, এনসিপিসহ ১১টি রাজনৈতিক দল একত্র হয়ে দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সংসদ হবে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি দিয়ে গঠিত। নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংসদ মানে হবে জনগণের কণ্ঠস্বর। সেখানে কোনো ভূমিদস্যু, কোনো দুর্নীতিবাজ, কোনো চাঁদাবাজের জায়গা হবে না।”

বনশ্রী এলাকার স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। পাশাপাশি রাস্তা-ঘাটের বেহাল দশা, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার অভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য, যা সামাজিক নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা যদি ক্ষমতায় যেতে পারি, তাহলে এই সমস্যাগুলো আর অবহেলায় পড়ে থাকবে না। গ্যাস সংকট সমাধানে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া হবে। রাস্তা-ঘাট সংস্কারে কোনো ধরনের দুর্নীতির সুযোগ রাখা হবে না।” তিনি আরও জানান, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা হওয়া উচিত থানা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় মানুষ থানায় গিয়ে ন্যায়বিচার পায় না, বরং হয়রানির শিকার হয়। তিনি আশ্বাস দেন, “আমরা ক্ষমতায় গেলে কেউ কোনো সমস্যায় পড়লে থানায় গেলে ওসির কাছ থেকে সহায়তা পাবে। পুলিশ হবে জনগণের সেবক, কোনো দলের বা ব্যক্তির নয়।”

তার এই বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও সংস্কারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের বড় একটি অংশ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য সেই জনমতকেই প্রতিফলিত করছে।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, এনসিপি ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং নীতির রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। তার মতে, ক্ষমতা যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার না হয়, তবে সেই ক্ষমতার কোনো মূল্য নেই। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে জনপ্রতিনিধি হওয়া মানে হবে জনগণের দায়িত্ব নেওয়া, সুযোগ নেওয়া নয়।”

বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই। রাজনীতিতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি তরুণদের আহ্বান জানান, তারা যেন রাজনীতিকে ভয় না পায়, বরং শুদ্ধ ও নৈতিক রাজনীতি গড়ে তুলতে এগিয়ে আসে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাহিদ ইসলামের বক্তব্য অনেকের মধ্যেই আশার সঞ্চার করেছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে আসছেন, বাস্তব পরিবর্তন দেখেননি। তবে নাহিদের বক্তব্যে সমস্যাগুলোর সরাসরি উল্লেখ এবং সমাধানের কথা থাকায় মানুষ নতুন করে ভাবছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির মতো নতুন ধারার রাজনৈতিক শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তাদের এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া। তবে নাহিদ ইসলামের মতো নেতারা যদি তাদের ঘোষিত নৈতিক অবস্থানে অটল থাকতে পারেন, তাহলে দেশের রাজনীতিতে একটি ভিন্ন ধারা তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে বনশ্রীর এই নির্বাচনী প্রচারণা শুধু একটি এলাকার ভোটের হিসাব নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে শুদ্ধতা, সংস্কার ও জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। নাহিদ ইসলামের ঘোষণাগুলো বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তার বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্নীতিবাজ ও অসৎ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার লড়াই এখন আরও জোরালো হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত