ক্ষমতায় এলে নোয়াখালী বিভাগের দাবি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
ক্ষমতায় এলে নোয়াখালী বিভাগের দাবি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নোয়াখালীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবিগুলো বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ক্ষমতায় গেলে নোয়াখালী বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনসহ এ অঞ্চলের ন্যায্য উন্নয়ন দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তার ভাষায়, এটি কোনো নির্বাচনী স্লোগান নয়, বরং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অংশ হিসেবে নেওয়া প্রতিশ্রুতি।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরে নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে জনসভাস্থলে। ব্যানার, ফেস্টুন আর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। জনসভাকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর রাজনীতিতে এক ধরনের নির্বাচনী উত্তাপও লক্ষ করা যায়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নোয়াখালীর মানুষ বহু বছর ধরে অবহেলিত। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে এ জেলার গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে তারা। তিনি জানান, নোয়াখালীবাসীর কাছ থেকে তিনি বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের দাবিসহ একাধিক যৌক্তিক দাবি পেয়েছেন এবং ক্ষমতায় গেলে ইনসাফের ভিত্তিতে এসব দাবি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তার কথায়, “আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুলে যাওয়ার রাজনীতি করি না। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করব ইনশাআল্লাহ।”

জনসভায় নোয়াখালীর উন্নয়নসংক্রান্ত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দাবির কথা তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, নোয়াখালী বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশন গঠনের পাশাপাশি হাতিয়া, কোম্পানীগঞ্জ ও সুবর্ণচর এলাকায় নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব এলাকার মানুষ বছরের পর বছর ভিটেমাটি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা। এ ছাড়া কোম্পানীগঞ্জ-ছোট ফেনী নদীতে ক্লোজার নির্মাণ এবং সোনাপুর থেকে হাতিয়া চেয়ারম্যানঘাট পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

সুবর্ণচরের আলোচিত নির্যাতনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে আবেগঘন বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে যে দুখিনী মা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তার সম্মান ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আজও জাতির বিবেককে নাড়া দেয়। তিনি ঘোষণা দেন, জামায়াত যদি সুবর্ণচরে নির্বাচিত হয়, তবে সেখানে একটি পৌরসভা প্রতিষ্ঠা করা হবে। তার মতে, এটি হবে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নির্যাতিত মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব পালনের প্রতীক।

যুব সমাজ ও বেকারত্ব প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, তারা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিয়ে অলস করে রাখতে চান না। বরং দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে যুব সমাজকে দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে চান। তিনি জানান, ১১ দলীয় জোটের অধিকাংশ প্রার্থীর বয়স ৪৫ বছরের নিচে, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নেতৃত্বে তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা বহন করে। তার কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, “সেদিন প্রত্যেক যুবক-যুবতী বলবে—আমিই বাংলাদেশ। আমাকে দেখে বাংলাদেশ কেমন, তা বুঝে নাও।”

সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে হলে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, পে-কমিশনের মাধ্যমে এমনভাবে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে, যাতে কোনো কর্মচারীকে ঘুষ বা অবৈধ পথে যেতে না হয়। তবে একই সঙ্গে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন, ন্যায্য সুযোগ দেওয়ার পরও যদি কেউ দুর্নীতির পথে যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থ উপার্জনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, “এখনই ছেড়ে দাও। হারাম পেটে ঢুকিও না। না শুনলে আমাদের গরম মূর্তি দেখতে বাধ্য হবে।” তার এই বক্তব্যে সমাবেশস্থলে উপস্থিত জনতার মধ্যে তুমুল সাড়া পড়ে যায়। অনেকেই এটিকে চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি শক্ত বার্তা হিসেবে দেখছেন।

নির্বাচন ও প্রতীক প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, আগামী ১২ তারিখের ভোট শুধু ব্যক্তি বা দলের নয়, বরং একটি আদর্শ ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পক্ষে রায়। তার ভাষায়, প্রথম ভোটটি হবে সংস্কার ও আজাদীর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট, আর দ্বিতীয় ভোটটি হবে ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ও শাপলা কলির পক্ষে। তিনি মনে করেন, এই প্রতীকগুলো ন্যায়বিচার ও মানবিক রাজনীতির প্রতিচ্ছবি।

জনসভায় তিনি নোয়াখালীর ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং প্রতীক তুলে দেন। নোয়াখালী-১ আসনে অধ্যক্ষ মাওলানা সাইফুল্লাহ, নোয়াখালী-৩ আসনে মাওলানা বুরহান উদ্দিন, নোয়াখালী-৪ আসনে মো. ইসহাক খন্দকার এবং নোয়াখালী-৫ আসনে বেলায়েত হোসেনের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি নোয়াখালী-২ আসনের সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া ও নোয়াখালী-৬ আসনের প্রার্থীর হাতে শাপলা কলি প্রতীক তুলে দেন তিনি।

এর আগে সকাল ৯টায় জেলা জামায়াতের আমির ও নোয়াখালী-৪ আসনের প্রার্থী মো. ইসহাক খন্দকারের সভাপতিত্বে জনসভা শুরু হয়। সভায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগাহ, ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েমসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। বক্তারা নোয়াখালীর উন্নয়ন, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াখালীতে জামায়াত আমিরের এই জনসভা কেবল একটি নির্বাচনী কর্মসূচি নয়, বরং অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন দাবিকে জাতীয় আলোচনায় আনার একটি কৌশল। নোয়াখালী বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও এটি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার সেই দাবিকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছে জামায়াত।

সব মিলিয়ে, নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠের এই জনসভা নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নোয়াখালীবাসীর প্রত্যাশা, এসব প্রতিশ্রুতি শুধু বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব রূপ পাবে। ক্ষমতায় গেলে জামায়াত কতটা সফলভাবে এই দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে। তবে আপাতত নোয়াখালীর রাজনীতিতে বিভাগ ও উন্নয়নের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে চলে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত