নওগাঁয় ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় ঝরল চার প্রাণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
নওগাঁয় ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় ঝরল চার প্রাণ

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নওগাঁর মহাদেবপুরে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় আবারও রক্তাক্ত হলো জনপদ। ব্যাটারিচালিত ভ্যানে ডাম্প (ড্রাম) ট্রাকের সজোরে ধাক্কায় চারজনের প্রাণহানি এবং একজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শুধু চারটি পরিবারকেই নয়, পুরো এলাকার মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। জীবিকার তাগিদে ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘর থেকে বের হওয়া মানুষগুলো আর কখনো ঘরে ফিরলেন না—এই নির্মম বাস্তবতায় স্তব্ধ স্বজন, প্রতিবেশী ও সহকর্মীরা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মহাদেবপুর উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের কয়েকজন কৃষক ও ব্যবসায়ী ভোরে দুটি ব্যাটারিচালিত চার্জার ভ্যানে করে কাঁচা হলুদ ও বেগুন নিয়ে মহাদেবপুর হাটের উদ্দেশে রওনা হন। হাটে পণ্য বিক্রি করে সংসারের খরচ জোগানোর স্বপ্ন ছিল সবার চোখে। কিন্তু মহাদেবপুর-নজিপুর সড়কের পাটকাঠি শিবপুর এলাকায় পৌঁছামাত্রই নজিপুরগামী একটি বালুবাহী ডাম্প ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভ্যান দুটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ভ্যান দুমড়ে-মুচড়ে যায়, ছিটকে পড়ে যাত্রীরা।

দুর্ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুইজন। স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পথেই আরও দুইজনের মৃত্যু হয়। আহত ভ্যানচালক সামন্তকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এনায়েতপুর ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের মাংরা উরাওয়ের ছেলে সঞ্চু উরাও (৪৮), জুটুয়া পাহানের ছেলে বিপুল পাহান (২২), খোকা পাহানের ছেলে বীরেন (৫০) এবং মৃত নরেন পাহানের ছেলে উজ্জ্বল পাহান (২৪)। সবাই স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের মাতম চলছে। বাড়ি বাড়ি কান্নার শব্দ, শোকাহত পরিবারের চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছায়া—সব মিলিয়ে নুরপুর গ্রাম যেন হঠাৎ থমকে গেছে।

নিহত সঞ্চু উরাওয়ের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রতিদিনের মতোই ভোরে বের হয়েছিলেন। বলেছিলেন, হাটে গিয়ে হলুদ বিক্রি করে ফিরবেন। এখন ঘরে শুধু তাঁর স্মৃতি আর সন্তানদের শূন্য চোখ। একই গ্রামের উজ্জ্বল পাহানের মা বলেন, ছেলেটা সংসারের একমাত্র ভরসা ছিল। এই বয়সে এমনভাবে চলে যাবে, তা কখনো ভাবিনি। এসব কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রা সড়কে জড়ো হন। অনেকেই অভিযোগ করেন, ওই সড়কে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল নতুন নয়। বিশেষ করে ভোরের দিকে বালুবাহী ও ডাম্প ট্রাকগুলো দ্রুতগতিতে চলাচল করে, অথচ তদারকি নেই। ব্যাটারিচালিত ভ্যান, সাইকেল ও ছোট যানবাহন এই সড়কে নিয়মিত চলাচল করলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।

মহাদেবপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই ট্রাকের চালক পালিয়ে যায়। তবে ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। এ বিষয়ে একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ সড়কে ভারী যান চলাচলের ক্ষেত্রে আলাদা সময়সূচি ও গতি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। ব্যাটারিচালিত ভ্যানগুলো ধীরগতির হলেও এগুলোতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যাপকভাবে বাড়ছে। কিন্তু সড়ক নকশা, আইন প্রয়োগ ও চালকদের প্রশিক্ষণের অভাবে ঝুঁকি কমছে না। বিশেষ করে ভোর ও রাতের সময় ভারী ট্রাকচালকদের ক্লান্তি, অতিরিক্ত গতি ও অসতর্কতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শোকাহত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁরা সড়কে স্পিড ব্রেকার, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারির দাবি তুলেছেন। একই সঙ্গে নিহত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন নিত্যদিনের উদ্বেগের নাম। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছেন, যাদের বড় একটি অংশ গ্রামীণ সড়কের ব্যবহারকারী। এই দুর্ঘটনাও সেই চিরচেনা বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠছে, আর কত প্রাণ গেলে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

নওগাঁর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, আইন প্রয়োগের ঘাটতি এবং মানবিক অবহেলার করুণ প্রতিচ্ছবি। আজ যারা চলে গেলেন, তারা ছিলেন পরিবারের ভরসা, গ্রামের পরিচিত মুখ। তাঁদের শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না। তবে এই মৃত্যু যদি আমাদের আরও সচেতন করে, নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ও কঠোর সিদ্ধান্তে বাধ্য করে—তবেই হয়তো তাঁদের আত্মা কিছুটা শান্তি পাবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই শোকাবহ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে এবং দ্রুত বিচার ও সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে না হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত