আর্থিক ধসের আশঙ্কায় জাতিসংঘ, জুলাইয়ের আগেই ফুরোতে পারে অর্থ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭০ বার
আর্থিক ধসের আশঙ্কায় জাতিসংঘ, জুলাইয়ের আগেই ফুরোতে পারে অর্থ

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বব্যাপী শান্তি, মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তার প্রধান বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম জাতিসংঘ আজ এক গভীর আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, চলমান সংকট সমাধানে জরুরি ও কাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই জাতিসংঘের নগদ অর্থ পুরোপুরি ফুরিয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিকে তিনি সরাসরি ‘অত্যাসন্ন আর্থিক ধস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা জাতিসংঘের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে গুতেরেস এই সতর্কবার্তা দেন। চিঠিটি পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানায়, মহাসচিব স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে বর্তমান আর্থিক কাঠামো ও চাঁদা পরিশোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সংস্থাটি কার্যত টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে। তাঁর ভাষায়, সদস্যরাষ্ট্রগুলো যদি একদিকে জাতিসংঘের আর্থিক বিধিবিধানের মৌলিক সংস্কারে সম্মত না হয় এবং অন্যদিকে নিয়মিত ও সময়মতো বার্ষিক চাঁদা পরিশোধ নিশ্চিত না করে, তাহলে সংস্থাটির আর্থিক পতন প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠবে।

এই চিঠির প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান, চাঁদা পরিশোধের জন্য এটি ‘এখনই সময়, নইলে আর কখনোই নয়’। তাঁর এই মন্তব্যে জাতিসংঘের ভেতরের গভীর উদ্বেগ ও তীব্র চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সংবাদ সম্মেলনে উপমুখপাত্র ফারহান হক বলেন, বিগত বছরগুলোতে যেভাবে জাতিসংঘ তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বা তারল্য এখন আর সংস্থার হাতে নেই। তিনি আরও জানান, মহাসচিব প্রতিবছরই ক্রমবর্ধমান জোরালো ভাষায় এই আর্থিক ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন, কিন্তু পরিস্থিতির বাস্তব উন্নতি খুব সীমিতই রয়ে গেছে।

এই সংকট এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। চলতি মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বেশ কয়েকটি জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ট্রাম্প সম্প্রতি ‘বোর্ড অব পিস’ বা ‘শান্তি বোর্ড’ নামে একটি নতুন উদ্যোগ চালু করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের নেপথ্য লক্ষ্য হলো জাতিসংঘকে দুর্বল করা এবং বহুপক্ষীয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক প্রভাববলয় তৈরি করা।

যদিও গুতেরেস তাঁর চিঠিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে সরাসরি দায়ী করেননি, তবে তাঁর বক্তব্যের সময়কাল ও প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমানোর সিদ্ধান্ত এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র, যা মোট বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ বহন করে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন, যার অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। এই দুই বৃহৎ অর্থদাতার অবস্থান ও সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জাতিসংঘ বিষয়ক পরিচালক লুই শারবোনো এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগকে এক ধরনের ‘পে-টু-প্লে’ বৈশ্বিক ক্লাবের সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে স্থায়ী সদস্য হতে হলে এক বিলিয়ন ডলার ফি দিতে হবে। শারবোনোর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠিত বহুপক্ষীয় সংস্থাকে দুর্বল করে দেবে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও জবাবদিহির কাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্পকে এক বিলিয়ন ডলারের চেক দেওয়ার পরিবর্তে সরকারগুলোর উচিত জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা।

জাতিসংঘের নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র ৩৬টি দেশ ২০২৬ সালের নিয়মিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, চাঁদা পরিশোধে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অনীহা বা বিলম্ব কীভাবে সংকটকে তীব্র করে তুলছে। গুতেরেস জানান, ২০২৫ সাল শেষে বকেয়া চাঁদার পরিমাণ রেকর্ড ১৫৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা জাতিসংঘের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

আর্থিক চাপে পড়ে ব্যয় সংকোচনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে জাতিসংঘ। চলতি জানুয়ারির শুরুতে সংস্থাটি ২০২৬ সালের জন্য ৩৪৫ কোটি ডলারের একটি বাজেট অনুমোদন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম। তবুও এই কাটছাঁট সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গুতেরেস তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বাজেট কমানো সত্ত্বেও নগদ অর্থের প্রবাহ এতটাই দুর্বল যে আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই তহবিল শূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই আর্থিক সমস্যার পেছনে একটি পুরোনো ও জটিল নিয়মকেও দায়ী করেছেন মহাসচিব। বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী, প্রতিবছর অব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ চাঁদার অর্থ সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে ফেরত দিতে হয়। গুতেরেস এই ব্যবস্থাকে ‘কাফকায়েস্ক’, অর্থাৎ অযৌক্তিক ও জটিল চক্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, জাতিসংঘ এমন এক পরিস্থিতিতে আটকে আছে যেখানে সংস্থার হাতে নেই এমন অর্থও ফেরত দেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়। তাঁর মতে, এই কাঠামোগত দুর্বলতা দ্রুত সংস্কার না করলে সংকট আরও গভীর হবে।

বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষা মিশন, শরণার্থী সহায়তা, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে জাতিসংঘের ভূমিকা অপরিসীম। আর্থিক ধসের মুখে পড়লে এসব কার্যক্রম সরাসরি বাধাগ্রস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশগুলোর ওপর। তাই গুতেরেসের এই সতর্কবার্তা শুধু একটি সংস্থার আর্থিক সংকটের গল্প নয়, বরং বৈশ্বিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর প্রশ্নও তুলে ধরছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগই একমাত্র পথ। সময়মতো চাঁদা পরিশোধ, আর্থিক বিধিবিধানের বাস্তবসম্মত সংস্কার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া জাতিসংঘের সামনে বিকল্প খুব কমই রয়েছে। অন্যথায়, বিশ্ব রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়ের মুখোমুখি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত