জমি বিরোধে হাতুড়িপেটায় বিধবা নারী নিহত গোপালগঞ্জে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৮ বার
জমি বিরোধে হাতুড়িপেটায় বিধবা নারী নিহত গোপালগঞ্জে

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জমি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। প্রতিপক্ষের হামলায় নাহিদা বেগম (৫০) নামের এক বিধবা নারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তার ছেলে মহিবুল্লাহ ওস্তা (২২) গুরুতর আহত হয়েছেন। রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার পাটগাতী মধ্যপাড়া গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোক আর আতঙ্ক, আর নিহতের পরিবার পড়েছে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

নিহত নাহিদা বেগম ওই গ্রামের মৃত শরিফুল ওস্তার স্ত্রী। এক বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছিল তার পরিবার। আহত মহিবুল্লাহ ওস্তা টুঙ্গিপাড়া সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। স্থানীয়রা জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারকে আগলে রাখার দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে।

গোপালগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুহাম্মদ সরোয়ার হোসেন এবং গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মনজুরুল কবীর নাহিদা বেগমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবেশী কাদের ওস্তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল নাহিদা বেগমের স্বামী শরিফুল ওস্তার। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। প্রায় ছয় মাস আগে উচ্চ আদালত শরিফুল ওস্তার পক্ষে রায় দেন এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করেন। আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে কাদের ওস্তা ওই জমির দখল ছাড়েননি।

রোববার সকালে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে জমিতে বেড়া দেওয়ার কথা ছিল শরিফুল ওস্তার পরিবারের। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তেজনা চরমে ওঠে। নিহতের দেবরের ছেলে মোহাম্মদ আরমান ওস্তা (২৮) অভিযোগ করেন, কাদের ওস্তা তার পাঁচ ছেলে—আব্দুল আলি, রাজু, ইয়াসিন, মিজান ও মানিকসহ কয়েকজনকে নিয়ে হাতুড়ি, রামদা ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।

মোহাম্মদ আরমান ওস্তা জানান, রোববার রাতে কাদের ওস্তার ছেলেরা দলবল নিয়ে মহিবুল্লাহর ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে হামলা শুরু করে। প্রথমে মহিবুল্লাহকে মারধর করা হয়। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে নাহিদা বেগমকে লক্ষ্য করে হাতুড়ি দিয়ে একের পর এক আঘাত করা হয়। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।

স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় নাহিদা বেগমকে উদ্ধার করে দ্রুত গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। আহত মহিবুল্লাহকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত রয়েছে এবং অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল, যদিও বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মনজুরুল কবীর বলেন, রাত পৌনে ১০টার দিকে নাহিদা বেগমকে হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায়, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যা শক্ত ও ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে আঘাতের ইঙ্গিত দেয়।

আহত মহিবুল্লাহ ওস্তা বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কাদের ওস্তা আমাদের জমি দখল করে রেখেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি। ছয় মাস আগে আদালত আমাদের পক্ষে রায় দেন। শনিবার টুঙ্গিপাড়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি জানানোয় প্রতিপক্ষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। রোববার রাতে পরিকল্পিতভাবে আমার মাকে হত্যা করা হয়েছে। আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই মারধর করা হয়।” তার কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, শোক আর অসহায়ত্বের মিশ্রণ।

ঘটনার পর মধ্যপাড়া গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিহতের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমেছে। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আদালতের রায় কার্যকরে ব্যর্থতার বিষয়ে। স্থানীয়দের মতে, যদি শুরুতেই আদালতের আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হতো, তাহলে হয়তো এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটত না।

পুলিশ সূত্র জানায়, ঘটনার পর অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

এই ঘটনা আবারও গ্রামবাংলায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের ভয়াবহ দিকটি সামনে নিয়ে এসেছে। সামান্য জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সময় এমন মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনে। বিশেষ করে স্বামীহারা নারীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে বলে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন।

মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের রায় বাস্তবায়নে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা না থাকলে বিচার পাওয়া সত্ত্বেও ভুক্তভোগীরা নিরাপদ থাকেন না। নাহিদা বেগমের মৃত্যু সেই ব্যর্থতারই করুণ উদাহরণ। তারা বলছেন, এই ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এমন সহিংসতা ঠেকানো কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে গোপালগঞ্জের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং জমি বিরোধ, আইনের শাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। নাহিদা বেগমের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে, আর তার পরিবারের সামনে এখন ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘ লড়াই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত