মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা কাটিয়ে জামিনে মুক্ত এরফান সোলতানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪১ বার
মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা কাটিয়ে জামিনে মুক্ত এরফান সোলতানি

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গত মাসের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া ২৬ বছর বয়সী ইরানি যুবক এরফান সোলতানিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। শনিবার জামিনে তার মুক্তির খবর নিশ্চিত করেছেন তার আইনজীবী, পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও বিষয়টি জানিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা ঘিরে যে উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে এই মুক্তি ইরানের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এরফান সোলতানি তেহরানের পশ্চিমে অবস্থিত ফারদিস শহরের একজন কাপড়ের দোকানের মালিক। গত ৮ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যখন ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের মধ্যেই সোলতানিকে আটক করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। গ্রেপ্তারের পরপরই তার বিরুদ্ধে গুরুতর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়, যা নিয়ে তার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা তৈরি হয়।

নরওয়ে-ভিত্তিক কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও দাবি করে, গ্রেপ্তারের কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানি কর্তৃপক্ষ সোলতানির পরিবারকে জানায় যে, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে। তবে কখন ও কীভাবে তা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। এই খবর দ্রুত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সোলতানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানের বিচার বিভাগ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, সোলতানির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড নয়, বরং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অপরাধে কারাদণ্ডযোগ্য অভিযোগ আনা হয়েছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি সংবাদ সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কিছু প্রতিবেদন ‘ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কোনো বিক্ষোভকারীকে ফাঁসি দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের নেই।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই শনিবার সোলতানিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। তার আইনজীবী আমির মুসাখানি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানান, দুই বিলিয়ন তোমান জামিনের বিনিময়ে তার মক্কেল মুক্তি পেয়েছেন। মুক্তির সময় তার মোবাইল ফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ইসনা এবং হেঙ্গাও উভয়ই জামিনে মুক্তির তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এরফান সোলতানির গ্রেপ্তারের খবর আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয় মূলত মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কার কারণে। এক পর্যায়ে তার এক আত্মীয় বিবিসি ফার্সিকে জানান, মাত্র দুই দিনের মধ্যেই একটি আদালত দ্রুত প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। যদিও এই তথ্য পরে ইরানি কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে, তবুও ওই খবর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই ঘটনায় সরব প্রতিক্রিয়া জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক পর্যায়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে। এই মন্তব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এরই মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক করে বলেন, যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ বা আক্রমণ আঞ্চলিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।

বিক্ষোভ দমন ঘিরে ইরানে যে মানবাধিকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ দিকে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর থেকে তারা অন্তত ৬ হাজার ৩০০ জনের নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি আরও ১৭ হাজার মৃত্যুর খবর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। নরওয়ে-ভিত্তিক আরেকটি সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) সতর্ক করে দিয়েছে, চূড়ান্ত নিহতের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিক্ষোভকারীরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন ছিল নজিরবিহীন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। খামেনি এক বক্তব্যে অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা পুলিশ, আইআরজিসি সদস্য এবং ব্যাংক ও মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। সরকারের দাবি, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য এই অভিযান প্রয়োজনীয় ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে এরফান সোলতানির জামিনে মুক্তি অনেকের কাছে একটি স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো প্রত্যাহার হয়নি এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান, তবুও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা আপাতত দূর হওয়ায় তার পরিবার ও সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই ঘটনা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক চাপ কখনো কখনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সোলতানির মুক্তি ইরানের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র বদলে দিচ্ছে না। দেশটিতে বিক্ষোভ দমন, গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে। এরফান সোলতানির ঘটনাটি তাই শুধু একজন ব্যক্তির মুক্তির গল্প নয়, বরং ইরানে চলমান রাজনৈতিক সংকট, বিচারব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত