প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হাঁটুর ব্যথা আজকাল অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জটিলতা তৈরি করছে। ছোট থেকে বড়, সবাইকে এই সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। জন্মগত সমস্যা, সংক্রমণ, আর্থ্রাইটিস, কার্টিলেজের আঘাত বা কখনো কখনো টিউমারের কারণে হাঁটুর ব্যথা দেখা দিতে পারে। বিশেষত হাঁটুর বাত বা অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা সাধারণত জটিল এবং অনেক সময় রোগীদের অস্ত্রোপচারের দিকেও যেতে হয়। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির কারণে এখন অস্ত্রোপচার ছাড়াই হাঁটুর ব্যথা নিরাময়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে উদ্ভাবিত হয়েছে প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা থেরাপি, যা সংক্ষেপে পিআরপি থেরাপি নামে পরিচিত।
পিআরপি থেরাপি মূলত মানুষের নিজস্ব রক্ত থেকে নেওয়া প্লাজমার সাহায্যে করা হয়। মানবদেহের রক্তে থাকে লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা এবং প্লাজমা বা রক্তরস। এই প্লাজমার মধ্যে থাকে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা, যা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত ও নতুন কোষ গঠনে সহায়ক। বিশেষ প্রক্রিয়ায় রক্ত থেকে প্লাটিলেট আলাদা করে তা ব্যথার স্থানে ইনজেকশন করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত নিরাময় হয়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটুর ব্যথা ও অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে পিআরপি থেরাপি কার্যকর।
অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ সুব্রত গড়াই জানিয়েছেন, এই থেরাপিতে প্রথমে রোগীর শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। রক্ত একটি বিশেষ যন্ত্রে ঘোরানো হয়, যাতে বিভিন্ন স্তর আলাদা হয় এবং প্লাটিলেটসমৃদ্ধ প্লাজমা আলাদা করে নেওয়া যায়। এরপর এই প্লাজমা আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে ইনজেকশন করা হয়। সাধারণত দুই সপ্তাহ অন্তর তিন ধাপে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়। সঠিকভাবে থেরাপিটি প্রয়োগ করা হলে অস্ত্রোপচার ছাড়াই হাঁটুর ব্যথা অনেকটাই কমতে পারে এবং রোগীর চলাচলে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসে।
পিআরপি থেরাপি প্রধানত প্রাথমিক বা মাঝারি পর্যায়ের অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য কার্যকর। দুর্ঘটনায় হাঁটু বা পায়ের আঘাত বা লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। কম বয়সী রোগীরা যারা অস্ত্রোপচার করতে চান না, তাদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পিআরপি থেরাপি নেওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, রোগীর নিজের রক্ত ব্যবহার হওয়ায় অ্যালার্জি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা খুব কম থাকে এবং স্টেরয়েডও ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।
তবে কিছু ক্ষেত্রে পিআরপি থেরাপি কার্যকর নাও হতে পারে। বিশেষত ৫০–৬০ বছরের বেশি বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে যদি হাঁটুর হাড় মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস শেষ পর্যায়ে পৌঁছে থাকে, তখন পিআরপি থেরাপি যথেষ্ট ফলাফল দিতে পারে না। সেই অবস্থায় হাঁটু প্রতিস্থাপনই একমাত্র সমাধান।
পিআরপি থেরাপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি ইনভেসিভ নয়। ছোট ইনজেকশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে প্লাজমা প্রয়োগ করা হয়, যা রোগীর পুনরুদ্ধারে সহায়ক। চিকিৎসা শুরু করার আগে রোগীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসক নির্ধারণ করেন কতটি ইনজেকশন এবং কোন সময় ব্যবধান রাখবে। অনেক রোগী থেরাপির পর স্বল্প সময়ের মধ্যে হাঁটুর ব্যথা ও ক্রমাগত জ্বালা কমতে অনুভব করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পিআরপি থেরাপি কেবল ব্যথা নিরাময় নয়, এটি হাঁটুর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক। এটি হাঁটুর আঘাতজনিত ক্ষতি পুনরায় মেরামত করে এবং রোগীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক করে। তাই হাঁটুর বাত বা অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে রোগীরা অস্ত্রোপচারের বিকল্প হিসেবে এই থেরাপি বিবেচনা করতে পারেন।
বর্তমান সময়ে হাঁটুর সমস্যায় ভোগা রোগীরা পিআরপি থেরাপি সম্পর্কে বেশি সচেতন হয়ে উঠছেন। এটি রোগীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ায়। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করা হলে ফলাফল দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। পিআরপি থেরাপি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং রোগীর নিজের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতার সংমিশ্রণ, যা হাঁটুর ব্যথা কমাতে ও জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।