হার্টের সুস্থতায় পটাশিয়াম কেন জরুরি, কতটুকু দরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
হার্টের সুস্থতায় পটাশিয়াম কেন জরুরি, কতটুকু দরকার

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের শরীরে হৃদ্‌যন্ত্র এমন এক অঙ্গ, যা এক মুহূর্তও বিশ্রাম নেয় না। গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখবার স্পন্দনের মাধ্যমে এই অঙ্গটি সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ করে। হৃদ্‌যন্ত্রের এই নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম সঠিকভাবে চলতে হলে প্রয়োজন হয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের, যার মধ্যে পটাশিয়াম অন্যতম। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা একমত যে, হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা রক্ষায় পটাশিয়ামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক মানুষই এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নন।

পটাশিয়াম মূলত শরীরের কোষের ভেতরে থাকা একটি খনিজ উপাদান, যা স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে। বিশেষ করে হৃদ্‌পেশির সংকোচন ও প্রসারণ এই খনিজের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। হৃদ্‌যন্ত্রের প্রতিটি স্পন্দনের পেছনে যে সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সংকেত কাজ করে, সেগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করে পটাশিয়াম। শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলে হৃৎস্পন্দন হয় ছন্দোবদ্ধ ও নিয়মিত। কিন্তু এই মাত্রা কমে গেলে বা অতিরিক্ত হয়ে গেলে দেখা দিতে পারে অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন, যা কখনো কখনো প্রাণঘাতী ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, পটাশিয়ামের ঘাটতি হলে হৃদ্‌যন্ত্রের পেশি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা কিংবা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আবার শরীরে অতিরিক্ত পটাশিয়াম জমলেও হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়। তাই পটাশিয়ামের ক্ষেত্রে ‘কম’ বা ‘বেশি’—উভয়ই ক্ষতিকর। প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রা বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতার সঙ্গে রক্তচাপের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত। উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’, কারণ এটি দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বা লবণ বের করে দিতে কিডনিকে সহায়তা করে। একই সঙ্গে রক্তনালির দেয়ালকে শিথিল রাখতে সাহায্য করে, ফলে রক্ত চলাচল সহজ হয় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষ পর্যাপ্ত পটাশিয়াম গ্রহণ করেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। বিশেষ করে লবণ বেশি খাওয়া মানুষের ক্ষেত্রে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাদ্য রক্তচাপের ক্ষতিকর প্রভাব কিছুটা হলেও কমাতে পারে। এ কারণে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষায় কম লবণ ও পর্যাপ্ত পটাশিয়াম গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়।

পটাশিয়াম গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ ও উপযোগী উপায় হলো প্রাকৃতিক খাবার। ফল, সবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য থেকে পাওয়া পটাশিয়াম শরীরে সহজে শোষিত হয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও কম থাকে। কলা পটাশিয়ামের একটি পরিচিত উৎস হলেও এটি একমাত্র নয়। কমলা, পেঁপে, তরমুজ, আলু, টমেটো, পালংশাক, শিম, ডাল, দুধ, মাছ ও মাংসের মতো খাবারেও পর্যাপ্ত পটাশিয়াম রয়েছে। নিয়মিত ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে আলাদা করে পটাশিয়াম সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম প্রয়োজন। এই পরিমাণটি একদিনে বিভিন্ন খাবার থেকে সহজেই পাওয়া সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, পটাশিয়াম সাপ্লিমেন্ট নিজে নিজে গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ অতিরিক্ত পটাশিয়াম হৃৎস্পন্দনের মারাত্মক সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই পটাশিয়াম ট্যাবলেট বা সিরাপ গ্রহণ করা উচিত নয়।

কিছু বিশেষ অবস্থায় পটাশিয়াম গ্রহণের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। যাঁদের কিডনির রোগ রয়েছে, তাঁদের শরীর থেকে অতিরিক্ত পটাশিয়াম বের হওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে সামান্য অতিরিক্ত পটাশিয়ামও তাঁদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে যাঁরা নির্দিষ্ট কিছু হৃদ্‌রোগের ওষুধ, যেমন ডাইইউরেটিক বা এসিই ইনহিবিটর সেবন করেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও পটাশিয়ামের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।

চিকিৎসকেরা বলছেন, হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখতে পটাশিয়াম কোনো যাদুকরী উপাদান নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত সুস্থ জীবনযাপনের অংশ। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান পরিহার, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, কম লবণ গ্রহণ এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস—এই সবকিছুর সঙ্গে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার যুক্ত হলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করে দৈনন্দিন ছোট ছোট অভ্যাসের ওপর। প্রতিদিন কী খাচ্ছি, কতটা লবণ গ্রহণ করছি, শরীরচর্চার সুযোগ কতটুকু পাচ্ছি—এসব বিষয়ই দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে পটাশিয়ামকে বলা যেতে পারে হৃদ্‌যন্ত্রের এক নীরব প্রহরী, যে নিঃশব্দে নিজের দায়িত্ব পালন করে যায়।

সবশেষে বলা যায়, সুস্থ হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য সচেতন খাদ্য নির্বাচনই হতে পারে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পদক্ষেপ। নিয়মিত পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের মাধ্যমে হৃদ্‌যন্ত্রকে শক্তিশালী ও সুস্থ রাখা সম্ভব। হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষায় আজ থেকেই সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে ভবিষ্যতের বড় বিনিয়োগ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত