বিশ্ব ক্রমেই বিপজ্জনক, তবে সংঘাত চায় না রাশিয়া: মেদভেদেভ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
বিশ্ব ক্রমেই বিপজ্জনক, তবে সংঘাত চায় না রাশিয়া: মেদভেদেভ

প্রকাশ: ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব পরিস্থিতি দিন দিন আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে—এমন সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। তবে একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ বাস্তবতার মধ্যেও রাশিয়া কোনো বৈশ্বিক সংঘাত বা বিশ্বযুদ্ধ চায় না। সোমবার ২ ফেব্রুয়ারি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব মন্তব্য করেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মেদভেদেভ বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত, শক্তিধর দেশগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাঁর ভাষায়, “পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক, তবে আমরা কোনো বিশ্বব্যাপী সংঘাতে আগ্রহী নই। আমরা বেপরোয়া নই।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে, রাশিয়া নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় হলেও অযৌক্তিক বা আত্মঘাতী সংঘাতের পথে হাঁটতে রাজি নয়।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক চরম উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ‘কোল্ড ওয়ার’-এর পর রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গভীর সংঘর্ষ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে রাশিয়ার ওপর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অন্যদিকে মস্কো দাবি করে, নিজেদের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সাক্ষাৎকারে মেদভেদেভ বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করেছে। ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ, ইউক্রেনে পশ্চিমা প্রভাব বৃদ্ধি এবং রাশিয়ার সীমান্ত ঘেঁষে সামরিক তৎপরতা মস্কোর জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, এই উপেক্ষা ও চাপের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মেদভেদেভ আরও বলেন, পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাত হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তিনি একাধিকবার সতর্ক করেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে পারমাণবিক ‘বিপর্যয়ের’ ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও তিনি স্পষ্ট করেছেন, রাশিয়া নিজে থেকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় না, তবে নিজেদের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়লে প্রতিরোধের সব উপায় খোলা থাকবে।

এই সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রসঙ্গেও কথা বলেন মেদভেদেভ। তিনি বলেন, ট্রাম্পের দূতরা রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছেন—এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় শুরু হওয়াকে তিনি ‘উৎসাহজনক’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সংলাপই একমাত্র পথ, যার মাধ্যমে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

তবে একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেন সরকার ও তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের কঠোর সমালোচনা করেন। ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো এই যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত হিসেবে বর্ণনা করছে এবং একে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী ভূমি দখলের প্রচেষ্টা বলে আখ্যা দিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, রাশিয়া যদি ইউক্রেনে সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর দিকেও আগ্রাসন চালাতে পারে। মস্কো অবশ্য এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

সাক্ষাৎকারে ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে মেদভেদেভ বলেন, ২০১৪ সালে ইউক্রেনে ময়দান বিপ্লবের মাধ্যমে একজন রুশপন্থি প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলে অস্থিরতার সূচনা হয়। এরপর রাশিয়া ক্রিমিয়াকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে নেয় এবং পূর্ব ইউক্রেনে মস্কো-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কিয়েভের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটই শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেয় বলে তাঁর ব্যাখ্যা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও আলোচনায় আসে মেদভেদেভের সাক্ষাৎকারে। জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত দখল মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই ধরনের আচরণ “আসলেই বাড়াবাড়ি।” বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো রাশিয়ার মিত্র। যদি কোনো বিদেশি শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করত, তাহলে ওয়াশিংটন নিঃসন্দেহে সেটিকে যুদ্ধের পদক্ষেপ হিসেবে দেখত—এমন তুলনা টেনে তিনি পশ্চিমা নীতির দ্বিচারিতার দিকে ইঙ্গিত করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মেদভেদেভের এই বক্তব্য একদিকে যেমন পশ্চিমা শক্তির প্রতি কঠোর বার্তা, অন্যদিকে তেমনি এটি একটি কৌশলগত অবস্থানও। বিশ্ব সংঘাত চায় না—এই ঘোষণা দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে রাশিয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক পথে হাঁটছে না। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিচ্ছেন, বর্তমান পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি চলতে থাকে, তাহলে একটি বৈশ্বিক সংঘাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সব মিলিয়ে, দিমিত্রি মেদভেদেভের এই সাক্ষাৎকার বিশ্ব রাজনীতির টানাপোড়েনের বাস্তব চিত্রই তুলে ধরে। একদিকে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি; অন্যদিকে সংলাপ ও কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা—এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে বর্তমান বিশ্ব। মেদভেদেভের ভাষায়, পৃথিবী সত্যিই খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, আর সেই বিপদ এড়াতে হলে বড় শক্তিগুলোর দায়িত্বশীল আচরণই হতে পারে সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত