সহানুভূতির অর্থনীতি, শোষণমুক্ত সমাজ: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
সহানুভূতির অর্থনীতি, শোষণমুক্ত সমাজ: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসলাম কেবল ইবাদতকেন্দ্রিক কোনো ধর্মীয় অনুশাসনের নাম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের প্রতিটি দিককে সুবিন্যস্ত ও মানবিক করতে চায়। ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মর্যাদা রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। এই দর্শনে অর্থ উপার্জন নিষিদ্ধ নয়, বরং বৈধ ও ন্যায়সংগত পন্থায় সম্পদ অর্জনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে কারো দুর্বলতা, দুঃখ বা বিপদকে পুঁজি করে লাভবান হওয়ার যে কোনো পথ ইসলাম কঠোরভাবে রুদ্ধ করেছে।

এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় সুদ নিষিদ্ধকরণ এবং নিঃস্বার্থ ঋণ বা করজে হাসানার প্রতি ইসলামের বিশেষ উৎসাহে। ইসলামের দৃষ্টিতে ঋণ হলো মানবিক সহযোগিতার একটি মাধ্যম, ব্যবসা নয়। আর ব্যবসা হতে হবে ঝুঁকি ও লাভ-লোকসানের ন্যায্য অংশীদারত্বের ভিত্তিতে, যেখানে কেউ একতরফা সুবিধা ভোগ করবে না।

সুদকে ইসলাম যে কতটা ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে, তার দৃষ্টান্ত পবিত্র কোরআনের ভাষায় অত্যন্ত স্পষ্ট। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও। আর যদি তোমরা তাওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না।’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, কুফর ছাড়া অন্য কোনো গুনাহের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনে এত কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়নি। এটি প্রমাণ করে যে সুদ কেবল একটি আর্থিক অপরাধ নয়; এটি আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ।

সুদের সামাজিক প্রভাবও ভয়াবহ। সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা ধনীকে আরও ধনী করে এবং দরিদ্রকে ধীরে ধীরে নিঃস্বতার দিকে ঠেলে দেয়। ঋণের ওপর সুদের বোঝা বাড়তে বাড়তে একসময় তা মানুষের সহনক্ষমতার বাইরে চলে যায়। বহু পরিবার এই চাপ সামলাতে না পেরে ভেঙে পড়ে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে এবং মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের ব্যবস্থা সরাসরি জুলুমের শামিল, কারণ এতে এক পক্ষ নিশ্চিত লাভবান হয়, আর অন্য পক্ষ নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু সুদগ্রহীতাকে নয়, বরং সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং তার সাক্ষী—সবার ওপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান অপরাধী। এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয়, সুদ একটি ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; বরং এটি একটি সামাজিক অপরাধ, যার দায় সমাজের প্রতিটি সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বহন করতে হয়।

সুদের বিপরীতে ইসলাম যে বিকল্প ব্যবস্থা উপস্থাপন করেছে, তা হলো নিঃস্বার্থ ঋণ বা করজে হাসানা। কারো বিপদে পাশে দাঁড়াতে ঋণ দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ প্রশ্নের ছলে বলেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন?’ এখানে আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার অর্থ তাঁর বান্দাদের সাহায্য করা। অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করাকে আল্লাহ নিজের কাছে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করেছেন।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, কোনো মুসলমান যদি অপর মুসলমানকে দুইবার ঋণ দেয়, তবে সে একবার সেই পরিমাণ দান করার সমান সওয়াব পায়। এই বাণী থেকে বোঝা যায়, ইসলাম দান ও ঋণ—উভয়কেই মানবিক সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছে, যেখানে লাভের হিসাব নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই মুখ্য।

ইসলাম শুধু ঋণ দেওয়ার কথাই বলেনি; ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও মানবিক আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যদি ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তার সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে সময় দিতে হবে। এমনকি ঋণ মাফ করে দেওয়াকে আল্লাহ আরও উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন। জাহেলি যুগে যেখানে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সুদের ওপর সুদ আরোপ করে মানুষকে চরম দুর্দশায় ফেলা হতো, সেখানে ইসলাম এসে সেই নিষ্ঠুর প্রথার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি নীতি প্রণয়ন করেছে।

হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি অভাবী ঋণগ্রহীতাকে সময় দেয়, সে দান-খয়রাতের সওয়াব পায়। আর যে সময় শেষ হওয়ার পরও মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়, সে প্রতিদিন দান করার সওয়াব পেতে থাকে। এটি ইসলামের আর্থিক ব্যবস্থার এক অনন্য মানবিক দিক, যেখানে পাওনাদারের অধিকার রক্ষা করা হলেও ঋণগ্রহীতার সম্মান ও মানসিক অবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে ইসলাম ঋণকে কখনোই প্রতারণা বা আত্মসাতের হাতিয়ার বানাতে অনুমোদন দেয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে ঋণ নেয়, আল্লাহ তার পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে ঋণ নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন। একইভাবে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করাকে রাসুল (সা.) জুলুম বলে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থাৎ ইসলামে যেমন পাওনাদারকে নম্র হতে বলা হয়েছে, তেমনি ঋণগ্রহীতাকেও সৎ ও দায়িত্বশীল হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, কেউ যদি তার সম্পদ বৃদ্ধি করতে চায়, তাহলে ইসলামে তার জন্য হালাল ব্যবসা ও বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত রয়েছে। মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, তিনি ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। ব্যবসার ক্ষেত্রে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি উভয় পক্ষকে বহন করতে হয়, যা ন্যায়সংগত। এককভাবে ব্যবসা করার সক্ষমতা না থাকলে ইসলাম মুশারাকা, মুদারাবা বা মুরাবাহার মতো শরিয়াহসম্মত পদ্ধতির মাধ্যমে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামের আর্থিক দর্শনের মূল কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ঋণ হবে সহানুভূতির প্রকাশ, শোষণের মাধ্যম নয়। আর ব্যবসা হবে ন্যায়ভিত্তিক অংশীদারত্বে, সুদের নিশ্চিন্ত লাভের ওপর নয়। এই নীতি বাস্তবায়িত হলে এমন একটি সমাজ গড়ে উঠতে পারে, যেখানে আর্থিক চাপ কাউকে আত্মহননের পথে ঠেলে দেবে না, যেখানে মানুষের দুঃখ অন্যের মুনাফার উৎস হবে না। ইসলামের লক্ষ্য এমন এক মানবিক অর্থনীতি, যেখানে সম্পদ মানুষের সেবায় নিয়োজিত হবে, মানুষের ওপর মানুষের শোষণে নয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত