টানা ছয় মাস রপ্তানি পতন, পোশাক খাতে সংকট ঘনীভূত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৫ বার
টানা ছয় মাস রপ্তানি পতন, পোশাক খাতে সংকট ঘনীভূত

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে টানা ছয় মাস ধরে পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত জানুয়ারি মাসে দেশের রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। যদিও আগের মাস ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রপ্তানি আয় কিছুটা বেড়েছে, তবু সামগ্রিকভাবে বার্ষিক ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকই রয়ে গেছে। এই ধারাবাহিক পতন দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে দেশের মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৪১ কোটি ডলারের কিছু বেশি। আগের মাস ডিসেম্বরের তুলনায় এটি প্রায় ১১ শতাংশ বেশি হলেও, গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় সামান্য কম। ডিসেম্বর মাসে যেখানে রপ্তানি আয় ছিল ৩৯৭ কোটি ডলার, সেখানে জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ডলার বেশি। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয়, মাসওয়ারি হিসেবে রপ্তানিতে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও আগের বছরের শক্ত ভিত্তির কারণে বার্ষিক তুলনায় তা এখনো ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারেনি।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৪১ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ২ হাজার ৮৯৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সাত মাসে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার কম রপ্তানি আয় হয়েছে, যা শতাংশের হিসাবে ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ পতন নির্দেশ করে। এই পতন সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক, কারণ রপ্তানি খাত দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎসগুলোর একটি।

রপ্তানিতে এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। মোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ কবীরের মতে, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা সময়মতো পণ্য বুঝে পাওয়ার বিষয়ে শঙ্কায় পড়েছে। ফলে তারা স্বাভাবিকের তুলনায় কম পরিমাণে রপ্তানি আদেশ দিচ্ছে বা আদেশ স্থগিত রাখছে। এতে করে রপ্তানিকারকরা নতুন করে চাপে পড়ছেন।

এর পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতির কারণে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার হওয়ায় এই প্রভাব সরাসরি দেশের পোশাক শিল্পে আঘাত হেনেছে। বর্তমানে মৌলিক পোশাক পণ্যের ওপর শুল্কভার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ভোক্তাদের জন্য বাড়তি ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প মূলত মৌলিক ও মাঝারি দামের পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। এসব পণ্যের প্রধান ক্রেতা হলো মধ্য ও নিম্ন আয়ের ভোক্তারা, যাদের ক্রয়ক্ষমতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারগুলোতে সাধারণ পোশাকের চাহিদা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন কম দামের পোশাকের বদলে তুলনামূলক বেশি দামি হলেও দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য পোশাক কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন। এই প্রবণতা বাংলাদেশের মৌলিক পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ইপিবির প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে পোশাক খাত থেকে আয় এসেছে দুই হাজার ২৯৮ কোটি ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল দুই হাজার ৩৫৫ কোটি ডলার। একক মাস হিসেবে জানুয়ারিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। জানুয়ারিতে পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৬১ কোটি ডলার, যা গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৩৬৬ কোটি ডলার।

পোশাক খাতের ভেতরে নিট বা গেঞ্জি জাতীয় পোশাকের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে। এই খাতে রপ্তানি হ্রাসের হার ২ দশমিক ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাকের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম হারে, মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিট পোশাকের প্রধান বাজারগুলোতেই বর্তমানে চাহিদা সবচেয়ে বেশি কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই খাতে।

তবে সব খাতেই যে নেতিবাচক চিত্র, তা নয়। রপ্তানি খাতের কয়েকটি উপখাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ হলেও হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ওষুধ শিল্পেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, যেখানে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশের মতো। চামড়া ও চামড়া পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশ, পাট ও পাটপণ্যে প্রায় ১২ শতাংশ এবং হোমটেক্সটাইল খাতে প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি চিত্রকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও তৈরি পোশাক শিল্পের দুর্বলতা পুরো খাতকে ভারসাম্যহীন করে তুলছে। কারণ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেখা দিলে কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

রপ্তানিকারকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণ সহজ হবে না। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধার, বাণিজ্য নীতিতে স্থিতিশীলতা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন। একই সঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

সব মিলিয়ে টানা ছয় মাসের রপ্তানি পতন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত। মাসওয়ারি কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেলেও বার্ষিক ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে হলে কাঠামোগত সংস্কার, নীতিগত সহায়তা এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির উন্নতি একান্ত প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত