ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার, বিতর্কে মুখ খুললেন ফিফা সভাপতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৪ বার
ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার, বিতর্কে মুখ খুললেন ফিফা সভাপতি

প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতি ও ক্রীড়াজগতের সংযোগ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে সেই আলোচনার কেন্দ্রে যখন উঠে আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম, তখন বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনই এক বিতর্কের জন্ম দেয় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। গত বছরের ডিসেম্বরে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করে সংস্থাটি। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠতে থাকে—একজন বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতাকে কীভাবে শান্তির প্রতীক হিসেবে সম্মান জানানো হলো?

এই সিদ্ধান্ত ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। মানবাধিকার সংগঠন, ক্রীড়া বিশ্লেষক, এমনকি সাধারণ ফুটবল সমর্থকদের একাংশও প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায়। অনেকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কার অভিবাসন নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বিভাজনমূলক বক্তব্য শান্তির ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে ফিফা সভাপতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে থাকে।

সমালোচনার মুখে পড়ে এবার মুখ খুলেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেই। সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। ইনফান্তিনো বলেন, বিশ্ব আজ গভীরভাবে বিভক্ত, আর সেই বিভাজন দূর করতে ফুটবল একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। তার মতে, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে যেখানে কখনোই ব্যবসা বয়কটের ডাক দেওয়া হয়নি, সেখানে শুধুমাত্র ফুটবলকে কেন বয়কটের শিকার হতে হবে—এই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ইনফান্তিনো স্পষ্ট করে বলেন, ফিফা কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়। তাদের মূল লক্ষ্য ফুটবলের মাধ্যমে মানুষকে কাছাকাছি আনা, বিভাজন কমানো এবং সংলাপের পথ তৈরি করা। ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পেছনেও সেই দর্শন কাজ করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, ফুটবল কখনোই দেয়াল তৈরি করে না, বরং দেয়াল ভাঙে।

এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতির কারণে কয়েকটি দেশ ও সমর্থক গোষ্ঠী ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক দিয়েছিল। সেই সময় ইনফান্তিনো স্পষ্টভাবে বয়কটের বিপক্ষে অবস্থান নেন। তিনি মনে করেন, ক্রীড়াকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে তার মৌলিক চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইনফান্তিনোর এই অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। একই সাক্ষাৎকারে তিনি রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কথা বলেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে রাশিয়া আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞাকে অনেকেই নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখলেও, ইনফান্তিনোর মতে, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে শান্তির পথ প্রশস্ত করেনি।

ফিফা সভাপতি বলেন, বয়কট ও নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় ঘৃণা ও হতাশা বাড়িয়ে দেয়। তার মতে, রাশিয়ার শিশু-কিশোররা যদি ইউরোপের মাঠে ফুটবল খেলতে পারে, তাহলে তা ভবিষ্যতে সংলাপ ও শান্তির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তিনি বিশ্বাস করেন, মাঠের প্রতিযোগিতা অনেক সময় রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়েও শক্তিশালী বার্তা দেয়।

তবে ইনফান্তিনোর এই বক্তব্য নিয়েও দ্বিমত রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, শান্তির কথা বলে এমন রাষ্ট্র বা নেতাদের পাশে দাঁড়ানো হলে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্পের মতো নেতার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফিফার অবস্থান মূলত বাস্তববাদী হলেও তা নৈতিক বিতর্ক এড়াতে পারছে না। ফুটবল যে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার সঙ্গে দায়িত্বও আসে। কোন সিদ্ধান্ত শান্তির পথে সহায়ক আর কোনটি বিতর্ক বাড়ায়—এই সীমারেখা নির্ধারণ করাই এখন ফিফার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ক্রীড়াজগৎ আর রাজনীতি আলাদা কোনো জগৎ নয়। একটির প্রভাব অন্যটির ওপর পড়ে। ইনফান্তিনো সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে বরং ফুটবলকে সংযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চান। কিন্তু সেই প্রয়াস কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া নিয়ে ফিফা সভাপতির বক্তব্য বিতর্ক কমানোর চেয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফুটবল কি সত্যিই রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে, নাকি এটি বৈশ্বিক রাজনীতিরই আরেকটি শক্তিশালী মঞ্চ—এই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত