রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ বার
রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপের মধ্যেও ব্যাংকারদের পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ব্যাংক খাতের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে আর্থিক শৃঙ্খলা, নিরীক্ষা বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় নৈতিকতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, কারণ এই খাতই দেশের কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।

সোমবার রাজধানীর বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা। সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে এই সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা উঠে আসে।

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো শুধু মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি লেনদেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং রপ্তানি-বাণিজ্যে সোনালী ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি জানান, বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি নেই এবং এর অ্যাডভান্স-ডিপোজিট (এডি) রেশিও সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে, যা ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতার ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার চাপ মোকাবিলায় ব্যাংকারদের দায়িত্বশীল ও পেশাদার ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা অনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বড় করপোরেট ব্যবসার তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বড় অঙ্কের ঋণে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে এবং সঠিক তদারকি না হলে তা খেলাপিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। বিপরীতে এসএমই উদ্যোক্তারা মাঠপর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা রাখেন। তাই এসএমই খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দিকটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সক্ষম হলেও সময়মতো ঋণ আদায়ে তারা পিছিয়ে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ সঠিক গ্রাহক নির্বাচন ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতি। উপযুক্ত গ্রাহক নির্বাচন করা গেলে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গভর্নর আরও জানান, সোনালী ব্যাংকসহ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ওপর অতীতে আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ এখনো বহাল রয়েছে। এসব বিধিনিষেধের কারণে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে, যার ফলে ঋণের প্রবাহ কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থা টেকসই নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সতর্কতার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল কাজ হলো আমানত সংগ্রহ করে তা উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করা। যদি সংগৃহীত আমানত বৃহৎ অর্থনীতিতে কার্যকর অবদান রাখতে না পারে, তাহলে ব্যাংকের অর্জন সীমিতই থেকে যাবে। তিনি সোনালী ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান, লাভজনকতা বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি খাতে অর্থায়ন জোরদার করতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে।

সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকও সম্মেলনে বক্তব্য দেন এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শওকত আলী খান স্বাগত বক্তব্যে বলেন, সোনালী ব্যাংক ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ, এসএমই অর্থায়ন এবং খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। তিনি বলেন, ব্যাংকারদের পেশাদারিত্বই পারে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই ব্যাংকারদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখার এই আহ্বান বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত