যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে মোদির কূটনীতি প্রশ্নের মুখে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশটির বিরোধী দল কংগ্রেসসহ একাধিক রাজনৈতিক শক্তি এই চুক্তিগুলোর স্বচ্ছতা, সময়োপযোগিতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন তুলে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা নয়াদিল্লির বদলে ওয়াশিংটন থেকে আসায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিরোধীদের মতে, এটি শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন নয়, বরং ভারতের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতির দুর্বলতারও বহিঃপ্রকাশ।

চলতি বাজেট অধিবেশনে ভারতের লোকসভায় বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে কংগ্রেস। দলটির নেতাদের মূল প্রশ্ন, এত বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের ঘোষণা কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় করল না। সোমবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করে জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুরোধেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে। এই ঘোষণাই রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় ভারত রাশিয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তেল কিনবে। পাশাপাশি মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে এবং প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করবে ভারত। এত বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক অঙ্গীকার এবং জ্বালানি নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়ে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দেওয়ায় বিরোধীদের সন্দেহ আরও বেড়েছে।

কংগ্রেস নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতীয় সংসদ ও জনগণকে অবহিত না করে কীভাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তাদের অভিযোগ, চুক্তির লিখিত শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। অথচ ট্রাম্পের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত মিলেছে যে, ভারতের কৃষিখাত মার্কিন পণ্যের জন্য আরও উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে। এতে দেশটির কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং দেশীয় শিল্প মারাত্মক চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিরোধীরা।

ভারতের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। বিরোধী দলগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য তুলনামূলকভাবে ভর্তুকিপ্রাপ্ত ও বৃহৎ পরিসরে উৎপাদিত। সেগুলো ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় কৃষকের পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে কর্মসংস্থান, আয় ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার সম্ভাব্য দাবি। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ভারত তুলনামূলক কম দামে রাশিয়ার তেল কিনে আসছে। বিরোধীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে তেল আমদানি করতে হলে ভারতের জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন খরচ, উৎপাদন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। তারা বলছেন, এটি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

কংগ্রেস নেতারা এই পরিস্থিতিকে মোদি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তারা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, এর আগেও ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ভারতের পক্ষ থেকে না এসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল। তাদের মতে, একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তের ঘোষণা বিদেশি নেতাদের মুখে শোনা ভারতের সার্বভৌম ভাবমূর্তির জন্য অস্বস্তিকর।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিও বিরোধীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই চুক্তির আওতায় প্রায় ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যে শুল্ক কমানো বা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিরোধীদের আশঙ্কা, একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর বাজার ভারতের জন্য খুলে দিলে দেশীয় কৃষি ও শিল্পখাত দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়বে। তারা মনে করছেন, এতে ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।

সরকারপক্ষ অবশ্য এখনো বিস্তারিত অবস্থান পরিষ্কার করেনি। বিজেপি নেতাদের অনেকে বলছেন, এই চুক্তিগুলো ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্যই করা হচ্ছে। তাদের দাবি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। তবে চুক্তির শর্ত প্রকাশ না হওয়ায় এই ব্যাখ্যা বিরোধীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত। সাধারণত এমন বড় চুক্তির ঘোষণা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারই করে থাকে। অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীলতা প্রশ্ন তোলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে। এই কারণেই মোদি সরকার বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।

কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর স্পষ্ট দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর সঙ্গে হওয়া সব বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণ শর্ত অবিলম্বে জনসমক্ষে আনতে হবে। সংসদে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি। তারা বলছেন, তা না হলে কৃষক, শিল্পখাত এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে সরকার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করার কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধীরা জাতীয় স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও কূটনৈতিক মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন তুলে চাপ বাড়াচ্ছে। এই বিতর্ক কোন পথে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে সরকার কত দ্রুত এবং কতটা পরিষ্কারভাবে চুক্তির শর্ত জনগণের সামনে তুলে ধরে তার ওপর।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত