রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তির মেয়াদ শেষ, বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৬ বার
রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি মেয়াদ শেষ

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি—পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ—নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সর্বশেষ এবং কার্যকর একমাত্র পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বুধবার মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। এর ফলে রাশিয়া আর এই চুক্তির আওতায় কোনো বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ নয় এবং কতগুলো পরমাণু অস্ত্র বা ওয়ারহেড তারা মোতায়েন করবে, সে বিষয়ে আর কোনো আইনি সীমা কার্যকর থাকছে না। রাশিয়ার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ প্রকাশ্যে আশঙ্কা জানিয়েছে যে, এই পরিস্থিতি একটি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার পথ খুলে দিতে পারে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চুক্তিটির মেয়াদ আরও অন্তত ১২ মাস বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমরা ধরে নিচ্ছি যে নিউ স্টার্ট চুক্তির পক্ষগুলো এখন আর এই চুক্তির প্রেক্ষাপটে কোনো বাধ্যবাধকতার মধ্যে নেই।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মস্কো কার্যত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা পরমাণু অস্ত্র মোতায়েনের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে বলে মনে করছে।

‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তি ছিল ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোর একটি। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয় পক্ষই কতটি কৌশলগত পরমাণু ওয়ারহেড এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতে পারবে, তার নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের মধ্যে। যদিও মেদভেদেভকে প্রায়ই ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে সেই সময় দুই দেশের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।

২০১১ সালে কার্যকর হওয়া এই চুক্তি পরমাণু অস্ত্র হ্রাস ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। চুক্তির আওতায় উভয় পক্ষ পরস্পরের পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ পেত এবং নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করত। এর ফলে পারস্পরিক সন্দেহ কমে এবং ভুল বোঝাবুঝি থেকে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাস পায় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

২০২১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয় পক্ষই জানিয়েছিল, পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংলাপ বজায় রাখা প্রয়োজন। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আলোচনাও কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে অনেক বিশ্লেষক বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। পরমাণু অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউ স্টার্টের অবসান মানে হলো দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তির মধ্যে আর কোনো কার্যকর ও বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নেই। এতে উভয় দেশই চাইলে অস্ত্র সংখ্যা বাড়াতে পারে, যা অন্য পারমাণবিক শক্তিগুলোকেও একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি করেছে। তিনি মস্কো ও ওয়াশিংটনকে বিলম্ব না করে একটি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। গুতেরেসের মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ও ব্যবহার নিয়ে স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা না গেলে মানবজাতির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতিসংঘের এই উদ্বেগ একেবারেই অমূলক নয়। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৯০ শতাংশ পরমাণু অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে। এই দুই দেশের মধ্যে যদি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। বিশেষ করে উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র, হাইপারসনিক অস্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর যুদ্ধব্যবস্থার যুগে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাশিয়ার সাম্প্রতিক অবস্থানের কারণে নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো বর্তমানে কঠিন। মার্কিন কর্মকর্তারা আগেও অভিযোগ করেছেন যে, রাশিয়া পরিদর্শন কার্যক্রম স্থগিত করে নিউ স্টার্টের শর্ত লঙ্ঘন করেছে।

এই সব টানাপোড়েনের মাঝেই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সংলাপ ও চুক্তির মাধ্যমেই বড় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরমাণু অস্ত্র নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে একটি ভয়াবহ যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছে।

নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়া শুধু একটি চুক্তির অবসান নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতিতে আস্থার সংকটের প্রতিফলন। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন কোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা সহজ হবে না, তবে সেটিই হয়তো একমাত্র পথ। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে বড় শক্তিগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ ও পারস্পরিক সংলাপের বিকল্প নেই।

এই মুহূর্তে বিশ্ব তাকিয়ে আছে মস্কো ও ওয়াশিংটনের দিকে। তারা কি পারমাণবিক অস্ত্রের দৌড়ে আবারও একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, নাকি বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে নতুন কোনো সমঝোতার পথে হাঁটবে—এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিশ্ব কতটা নিরাপদ থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত