প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শুধু বড় শট মারলেই আর ব্যাটসম্যান হওয়া যায় না। এই সংস্করণে টিকে থাকতে হলে পেস আর স্পিন—দুই ধরনের বোলিংয়ের বিরুদ্ধেই সমানভাবে কার্যকর হতে হয়। কারণ ম্যাচের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ধরনের বোলারদের মোকাবিলা করতে হয় ব্যাটসম্যানদের। পাওয়ারপ্লেতে পেসারদের গতির পরীক্ষা, মাঝের ওভারে স্পিনারদের ফাঁদ, আবার ডেথ ওভারে ফিরে আসে পেসের আগুন। এই তিন ধাপেই সফল হতে না পারলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন।
যেকোনো দিনে যে কোনো ব্যাটসম্যানই পেস বা স্পিনের বিপক্ষে বিধ্বংসী ইনিংস খেলতে পারেন। কিন্তু নিয়মিতভাবে দুই ধরনের বোলিংয়ের বিরুদ্ধেই সমান দাপট দেখানো ক্রিকেটার হাতে গোনা। ক্রিকেটবিষয়ক প্রভাবশালী পোর্টাল ইএসপিএনক্রিকইনফোর বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে পূর্ণ সদস্য দেশের মাত্র ১০ জন ব্যাটসম্যান আছেন, যাঁরা ন্যূনতম ৫০ বল খেলে পেস ও স্পিন—দুই ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষেই ১৫০-এর বেশি স্ট্রাইক রেট ধরে রাখতে পেরেছেন। সংখ্যাটা ছোট হলেও এই তালিকার গুরুত্ব অনেক বড়।
এই ১০ জনের মধ্যে চারজনই ভারতের, যা বর্তমান টি-টোয়েন্টি বাস্তবতায় খুব একটা বিস্ময়ের নয়। ভারত এই মুহূর্তে টি-টোয়েন্টির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও তারা এই সংস্করণের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর ভারত তিনবার ২৫০ বা তার বেশি রান তুলেছে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে। পূর্ণ সদস্য দেশের মধ্যে এই সময়ে এমন স্কোর হয়েছে মাত্র আরও দুইবার। তুলনামূলকভাবে জিম্বাবুয়ে একই কীর্তি দেখালেও তাদের প্রতিপক্ষ ছিল সেশেলস, গাম্বিয়া ও বতসোয়ানার মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল।
ভারতের চার ব্যাটসম্যানের মধ্যে ওপেনার অভিষেক শর্মার নাম থাকাটা প্রত্যাশিতই। আক্রমণাত্মক মানসিকতা আর ক্লিন হিটিং তাঁর ব্যাটিংয়ের মূল বৈশিষ্ট্য। পাওয়ারপ্লেতে পেসারদের ওপর চড়াও হওয়া হোক কিংবা স্পিনের বিপক্ষে স্লগ সুইপ—সবকিছুতেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য চোখে পড়ার মতো। তবে তালিকার বাকি তিন ভারতীয় নাম আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে।
এর মধ্যে একজন শিবম দুবে। অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত হলেও ভারতের টি-টোয়েন্টি একাদশে তাঁর জায়গা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কিন্তু ব্যাট হাতে তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বলছে, সুযোগ পেলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে। পেসের বিপক্ষে শক্তিশালী স্ট্রোক আর স্পিনে লং অন–লং অফের ওপর দিয়ে অনায়াস ছক্কা মারার সামর্থ্য তাঁকে এই তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।
আরেকটি নাম সূর্যকুমার যাদব। দীর্ঘদিন অফ ফর্মে থাকার পর সর্বশেষ নিউজিল্যান্ড সিরিজে তিনি আবার নিজের চেনা ছন্দে ফিরেছেন। সূর্যকুমারের ব্যাটিং মানেই অপ্রচলিত শট, ৩৬০ ডিগ্রি কভারেজ আর বোলারদের ওপর মানসিক চাপ। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর স্ট্রাইক রেট দুই ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষেই ১৫০ ছাড়িয়ে যাওয়াটা প্রমাণ করে, ফর্মে ফিরলে তিনি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানদের একজন।
তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর নাম যশস্বী জয়সওয়াল। কারণ তিনি সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে ছিলেন না। তবু বিশ্বকাপের পরের সময়টায় তাঁর ব্যাটিং পরিসংখ্যান এতটাই উজ্জ্বল যে, পেস ও স্পিন—দুইয়ের বিপক্ষেই ১৫০-এর বেশি স্ট্রাইক রেট ধরে রেখে এই এলিট তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। এটি ভারতের ব্যাটিং গভীরতারই প্রতিফলন, যেখানে বিশ্বকাপ দলে না থেকেও কেউ এমন প্রভাব ফেলতে পারেন।
এই তালিকা ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সঞ্জু স্যামসনকে নিয়ে। বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে স্পিনের বিপক্ষে তিনি করেছেন ৩০৫ রান। তাঁর গড় ৫০.৮৩ এবং স্ট্রাইক রেট ১৭২.৩১, যা যে কোনো দলের জন্য স্বপ্নের মতো পরিসংখ্যান। পেসের বিপক্ষে তুলনামূলকভাবে কিছুটা সমস্যায় পড়লেও গড় ২১.০০ আর স্ট্রাইক রেট ১৪৬.১৫—টি-টোয়েন্টির বিচারে একেবারেই খারাপ নয়। তবু বিশ্বকাপের প্রথম একাদশে তাঁর জায়গা অনিশ্চিত। এর মূল কারণ তাঁর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী ঈশান কিষান। পেসের বিপক্ষে ঈশানের স্ট্রাইক রেট ২১৫.৬৮ এবং স্পিনে ২৫০—অবিশ্বাস্য রকম আক্রমণাত্মক। যদিও ন্যূনতম ৫০ বল না খেলায় তিনি এই তালিকায় জায়গা পাননি।
ভারতের বাইরে তাকালে দেখা যায়, ইংল্যান্ডের ওপেনার ফিল সল্ট ও বেন ডাকেট নিয়মিতভাবেই পেস ও স্পিন—দুইয়ের বিপক্ষেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করছেন। ইংল্যান্ডের ‘বাজবল’ দর্শনের ছাপ স্পষ্ট তাঁদের ব্যাটিংয়ে। অস্ট্রেলিয়ার টিম ডেভিড শেষের দিকে নেমে যেভাবে পেসারদের ইয়র্কারও গ্যালারিতে পাঠাতে পারেন, তাতে স্পিনের বিপক্ষেও তাঁর শক্তি কম নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্টন ডি কক অভিজ্ঞতার সঙ্গে আগ্রাসন মিশিয়ে দুই ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষেই ধারাবাহিক স্ট্রাইক রেট ধরে রেখেছেন।
নিউজিল্যান্ডের টিম সাইফার্ট এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের শিমরন হেটমায়ারও এই তালিকায় আছেন। দুজনের ব্যাটিংয়ের ধরন আলাদা হলেও মিল আছে এক জায়গায়—বোলারের ধরন যাই হোক, তাঁরা আক্রমণাত্মক থাকতে ভয় পান না। বিশেষ করে হেটমায়ারের ক্ষেত্রে স্পিনের বিপক্ষে শক্তি আর পেসের বিপক্ষে টাইমিং—দুটোই সমান কার্যকর।
এই তালিকা আসলে আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। এখন আর শুধু স্পিন–কিলার বা পেস–হিটার হলেই চলে না। সফল হতে হলে দুই ক্ষেত্রেই দক্ষ হতে হয়। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই দক্ষতাই পার্থক্য গড়ে দেয় শিরোপা আর হতাশার মধ্যে।
ভারত যেহেতু বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা কি এই ‘পেস–স্পিন পিটুনি’র ধারা ধরে রাখতে পারবে? পরিসংখ্যান বলছে, সম্ভাবনা যথেষ্ট। তবে টি-টোয়েন্টির অনিশ্চয়তায় শেষ কথা বলা যায় না। একদিনে বদলে যেতে পারে সব হিসাব। তবু এই ১০ জন ব্যাটসম্যানের পরিসংখ্যান নিশ্চিতভাবেই বোলারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে।