নাইজেরিয়ায় গ্রামজুড়ে গণহত্যা, প্রাণ গেল অন্তত ১৬২ জনের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
নাইজেরিয়ায় সশস্ত্র হামলায় নিহত

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ নাইজেরিয়ায় আবারও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাক্ষী হলো বিশ্ব। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় কুয়ারা রাজ্যের দুটি গ্রাম—ওরু ও নুকু—তে সশস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬২ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার, ৪ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত এই ভয়াবহ হামলাকে চলতি বছরে নাইজেরিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী সহিংস ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। শান্ত গ্রামজীবনের ওপর এমন নির্মম আঘাতে দেশজুড়ে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ওমর বায়ো বুধবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, প্রাথমিকভাবে নিহতের সংখ্যা ১৬২ হলেও উদ্ধার কার্যক্রম চলমান থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহ করা ‘লাকুরাওয়া’ নামের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই হামলার পেছনে জড়িত থাকতে পারে। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো সশস্ত্র সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবু হামলার ধরন ও আদর্শিক প্রচারণা জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর কৌশলের সঙ্গেই মিলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সশস্ত্র হামলাকারীরা প্রথমে গ্রাম দুটির বাসিন্দাদের একত্রিত করে। এরপর তাদের হাত পেছনে বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। কায়ামা অঞ্চলের রাজনীতিবিদ সাইদু বাবা আহমেদ জানান, হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি বন্দুকধারীরা ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং খাদ্যগুদামে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই বসতবাড়িগুলো পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে, আর গ্রামের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে।

হামলার পর সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় মরদেহ উদ্ধার ও এলাকা তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। আশপাশের বনাঞ্চল ও ঝোপঝাড়ে হামলাকারীরা লুকিয়ে থাকতে পারে—এই আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, এই ঘটনায় গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শাসকসহ বেশ কয়েকজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে পরিবার ও স্বজনদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেছে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ১৭০ জনেরও বেশি হতে পারে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, গত পাঁচ মাস ধরে বন্দুকধারীরা গ্রামবাসীদের নিয়মিত হুমকিমূলক চিঠি পাঠাচ্ছিল। সেই চিঠিতে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার অথবা তাদের মতাদর্শ মেনে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত এমন ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে।

গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামলাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় জিহাদি মতাদর্শ প্রচার করছিল। তারা নাইজেরিয়া রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে শরিয়া আইন অনুসরণের দাবি জানিয়ে আসছিল। মঙ্গলবার একটি ধর্মীয় সমাবেশে গ্রামবাসীরা প্রকাশ্যে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। স্থানীয়দের ধারণা, ওই প্রত্যাখ্যানই হামলার তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরপরই সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে গ্রামে ঢুকে গণহত্যা চালায়।

কুয়ারা রাজ্যের গভর্নর আবদুল রহমান আবদুল রাজাক এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসীদের কাপুরুষোচিত ও অমানবিক কাজ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন। গভর্নরের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, রাজ্যে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান আরও বিস্তৃত করা হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা নাইজেরিয়াজুড়ে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বোকো হারাম ও ইসলামিক স্টেটের শাখা সংগঠনগুলোর জিহাদি বিদ্রোহ থামছেই না। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সশস্ত্র ডাকাত ও অপহরণকারী চক্র সক্রিয়, আর মধ্যাঞ্চলে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সহিংসতা লেগেই আছে। এসব সহিংসতায় সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মাত্র কয়েক দিন আগেই, গত ৩০ জানুয়ারি নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনী কুয়ারা রাজ্যে অভিযানে ১৫০ জন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার দাবি করেছিল। সে সময় সরকার বলেছিল, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে বড় সাফল্য এসেছে। কিন্তু তার কয়েক দিনের মধ্যেই বেসামরিক জনগণের ওপর এমন ভয়াবহ হামলা দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, সামরিক সাফল্যের দাবির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।

এই হামলা শুধু নাইজেরিয়ার জন্য নয়, পুরো আফ্রিকা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তারা মনে করছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু সামরিক অভিযান নয়, বরং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, আস্থা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

ওরু ও নুকু গ্রামের ধ্বংসস্তূপের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে এখন শুধু শোক আর অনিশ্চয়তা। প্রিয়জন হারানোর বেদনা, ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ার হতাশা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আতঙ্ক—সব মিলিয়ে তাদের জীবন এক মুহূর্তে বদলে গেছে। এই গণহত্যার বিচার ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে, নাইজেরিয়ায় এমন রক্তাক্ত অধ্যায় যে আরও লেখা হবে না—সে নিশ্চয়তা এখনো মেলেনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত