প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান বিতর্কিত ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে শ্রমিকদের তীব্র অসন্তোষ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) নতুন মাত্রা পেয়েছে। বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা বাতিলের দাবিতে ডাকা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি চলাকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন সরাসরি শ্রমিকদের মুখোমুখি হন। এ সময় কয়েকশ শ্রমিক-কর্মচারী উপদেষ্টার গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করে। পরে উপদেষ্টা শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপদেষ্টার গাড়িবহর চট্টগ্রাম বন্দরের ৪ নম্বর জেটি গেট দিয়ে কাস্টমস মোড়ে পৌঁছালে আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীরা গাড়িবহরটি আটকে দেন। শ্রমিকরা এনসিটি ইজারা বাতিলের দাবি জানিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে উপদেষ্টা গাড়ি থেকে নেমে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করেন এবং তাদের জড়িয়ে ধরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে তিনি বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন।
বন্দর ভবনে উপদেষ্টা চলমান সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলা বৈঠকের পর তিনি গণমাধ্যমকে জানান, বন্দর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি হচ্ছে। এ সময় তিনি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সংকট সমাধানের আশাও প্রকাশ করেন। তবে বৈঠকের পর বের হওয়ার সময় আবারও আন্দোলনরত শ্রমিকদের স্লোগানের মুখোমুখি হন। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনসহ অন্যান্য নেতারা উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করেন।
এর আগে, অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির দ্বিতীয় দিনে বন্দরের ৪ নম্বর গেটে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের কঠোর অবস্থান দেখা গেছে। ওই দিন কোনো শ্রমিককে বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ পায়। তারা হুঁশিয়ারি দেন, এনসিটি ইজারা চুক্তি বাতিল না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে বৃহস্পতিবারও বন্দরের সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বহির্নোঙর থেকে জাহাজ আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে এবং পণ্য খালাসের অপেক্ষায় জেটিতে একাধিক জাহাজ আটকা পড়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে অচল করে দিয়েছে এবং বন্দর কার্যক্রমের উপর নির্ভরশীল ব্যবসা ও রফতানিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “বন্দরের অচলাবস্থায় দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষতি হচ্ছে। শ্রমিকদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে এই সংকট দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি। আমরা চাই, সকল পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাক।” শ্রমিক নেতারা উল্লেখ করেন, তারা বন্দর চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়েও বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দাবি জানিয়েছেন যে, এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিল না হলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে।
অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, শ্রমিকরা বন্দরের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের ওপর গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা মনে করছেন, ইজারা প্রক্রিয়া ও বহির্বর্তী ব্যবস্থাপনার কারণে শ্রমিকদের অধিকার ও বন্দর কার্যক্রমের স্বচ্ছতা হুমকির মুখে রয়েছে। অনির্দিষ্টকালীন কর্মবিরতির এই পরিস্থিতি বন্দরের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে এবং দ্রুত সমাধান না হলে অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মসূচি স্থগিত থাকার কারণে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বন্দরের জাহাজ ও পণ্য খালাসে বিলম্ব এবং কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই অচলাবস্থার দ্রুত সমাধানই সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বন্দরের বিভিন্ন অংশে কঠোর অবস্থানে থাকেন। শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে মানিয়ে চলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হচ্ছে।