বেলুচিস্তানে রক্তক্ষয়ী অভিযান, নিহত ২১৬ বিচ্ছিন্নতাবাদী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৬ বার
বেলুচিস্তানে রক্তক্ষয়ী অভিযান, নিহত ২১৬ বিচ্ছিন্নতাবাদী

প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চালানো এক সপ্তাহব্যাপী সামরিক অভিযানে অন্তত ২১৬ জন সশস্ত্র বিদ্রোহী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রদেশটিতে এটিই সবচেয়ে বড় ও ব্যাপক সামরিক অভিযানের একটি বলে মনে করা হচ্ছে, যা নতুন করে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের বেলুচ সংকটকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

পাকিস্তানের আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় হলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সবচেয়ে অনুন্নত প্রদেশ বেলুচিস্তান বহু বছর ধরেই সহিংসতা, বিদ্রোহ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) এই প্রদেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে, যখন নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) একযোগে স্কুল, ব্যাংক, বাজার, সরকারি ভবন ও নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলা চালায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল সংগঠনটির ইতিহাসে অন্যতম বড় ও সমন্বিত হামলা, যা পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিনের হামলায় অন্তত ২২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এই প্রাণহানির পরপরই সেনাবাহিনী ‘রাদ্দুল ফিতনা-১’ নামে একটি গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করে। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা, দখলকৃত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং প্রদেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য এবং সেনা, আধাসামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় বেলুচিস্তানের বিভিন্ন দুর্গম ও মরুভূমি অধ্যুষিত এলাকায় অভিযান চালানো হয়, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহীরা আশ্রয় নিয়ে আসছিল।

নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অভিযানের শুরুতে বিদ্রোহীরা কয়েকটি এলাকায় সরকারি ভবন, পুলিশ স্টেশন ও যোগাযোগ অবকাঠামো দখল করে নেয়। মরুভূমি বেষ্টিত নুশকি শহর প্রায় তিন দিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কার্যত নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই সময় শহরের বাইরে থেকে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। পরে ব্যাপক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী নুশকি শহর পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

নুশকিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। আকাশপথে নজরদারি ও স্থলবাহিনীর সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের অবস্থান শনাক্ত করে একের পর এক অভিযান চালানো হয়। সেনাবাহিনীর দাবি, এই অভিযানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বড় ধরনের অস্ত্রভাণ্ডার ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে।

খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশটির ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত কৌশলগত। এটি ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে এবং এখানে চীনের অর্থায়নে গড়ে ওঠা গওয়াদার গভীর সমুদ্রবন্দরসহ একাধিক বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেক বেলুচ নেতা ও সংগঠন অভিযোগ করে আসছে, প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে স্থানীয় জনগণ ন্যায্য অংশ পাচ্ছে না।

দীর্ঘদিন ধরেই বেলুচিস্তানে সহিংসতা চলমান। স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী বেলুচদের একটি অংশ অধিক স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক অধিকার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এই আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী তৎপরতা হিসেবে বিবেচনা করে আসছে এবং কঠোর সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বরাবরই বেলুচিস্তানের সামরিক অভিযানে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছে। যদিও সর্বশেষ অভিযানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দাবি করেছে, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই সামরিক অভিযান বেলুচিস্তানের দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাসে আরেকটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায় যোগ করল। একদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অসন্তোষ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই বারবার সহিংসতার চক্রে ফিরে যাচ্ছে প্রদেশটি। টেকসই সমাধানের জন্য কেবল সামরিক পদক্ষেপ নয়, রাজনৈতিক সংলাপ ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

সব মিলিয়ে, বেলুচিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে ২১৬ জন বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হওয়ার দাবি পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। এই অভিযান স্বল্পমেয়াদে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বেলুচ সংকটের সমাধান নাকি নতুন করে উত্তেজনা বাড়াবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com