ঢাকা-১৮ আসনে প্রচারণার বৈষম্য, ধোঁকা আর প্রত্যাশা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭১ বার
ঢাকা-১৮ আসনে প্রচারণার বৈষম্য, ধোঁকা আর প্রত্যাশা

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-১৮-এ। উত্তরা, তুরাগ, উত্তরখান ও দক্ষিণখানসহ বিস্তৃত এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ছাড়িয়েছে। বিপুল ভোটার আর বহুমাত্রিক জনবিন্যাসের কারণে ঢাকা-১৮ বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এবারের নির্বাচনী মাঠে প্রচারণার দৃশ্যপট সমান নয়। কোথাও ব্যানার–ফেস্টুনে ভরে আছে অলিগলি, আবার কোথাও প্রার্থীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে শুধু মানুষের মুখে মুখে।

এই বৈষম্যের মধ্যেই প্রচারণার শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির প্রার্থী সাবিনা জাবেদ। আম প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সাবিনা জাবেদ এই আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী। নির্বাচনী প্রচারের জন্য ব্যানার ও ফেস্টুন তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন এক ব্যক্তিকে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কিছুই সরবরাহ না করায় শুরুতেই পিছিয়ে পড়তে হয় তাঁকে।

ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থী সাবিনা জাবেদ আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘যারে ব্যানার করতে দিয়েছিলাম, সে করে দেয়নি। সময়মতো ব্যানার না দিয়ে ধোঁকা দিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে টাকা দিয়েছিলাম। পরে বাধ্য হয়ে আরেকজনের কাছে ব্যানার করতে দিয়েছি।’ তাঁর ভাষায়, এই বিলম্বে শুরুতেই যে সময়টা হারাতে হয়েছে, সেটি পুষিয়ে নিতে এখন বাড়তি পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

তবে প্রতিকূলতার মাঝেও আশাবাদী সাবিনা জাবেদ। তিনি বলেন, এলাকায় প্রচারে বের হলে অনেক ভোটারই তাঁকে দেখে বলছেন, “আপা আপনাকেই ভোট দেব।” এই সাড়া তাঁকে আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা-১৮ আসনে আরেক ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে বাসদের প্রার্থী সৈয়দ হারুন-অর-রশীদের ক্ষেত্রে। মই প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা এই প্রার্থী ব্যানার–ফেস্টুনের অভাবে প্রচারণায় পিছিয়ে রয়েছেন। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েও খুব বেশি সাড়া পাননি। শেষ পর্যন্ত নিজের দুই মেয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিছু ব্যানার টাঙাতে হয়েছে।

সৈয়দ হারুন-অর-রশীদ বলেন, ভোটারদের কাছ থেকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। অনেকেই তাঁকে বলছেন, ‘আপনার মতো লোককেই আমরা খুঁজতেছি।’ কিন্তু একই সঙ্গে ভোটারদের আক্ষেপও শুনতে হচ্ছে—আপনার প্রচার নাই, লোকজন নাই। এই বাস্তবতা তাঁর প্রচারণার সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১, ১৭, ৪৩ থেকে ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৮ আসনের আওতায় রয়েছে উত্তরার ১৪টি সেক্টর, দলিপাড়া, বাউনিয়া, তুরাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখান, ডুমনি, খিলক্ষেত ও কুড়িল এলাকা। এত বড় ও বৈচিত্র্যময় এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে অর্থ ও সংগঠনের শক্তি যে বড় ভূমিকা রাখে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে মাঠের চিত্রে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১০ জন প্রার্থী। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন বিএনপির প্রার্থী ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, তাঁর ব্যানার–ফেস্টুনই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি—সবখানেই ধানের শীষের উপস্থিতি দৃশ্যমান।

তাঁর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তাঁর পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আনোয়ার হোসেনের হাতপাখা প্রতীকের ব্যানার–ফেস্টুনও বিভিন্ন এলাকায় বেশ চোখে পড়ছে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না কেটলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন এই আসনে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী জাকির হোসেন লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন মোমবাতি প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রেল ইঞ্জিন প্রতীকে নির্বাচন করছেন মহিউদ্দিন হাওলাদার। তবে ব্যানার–ফেস্টুনে নয়, তিনি ভিন্ন পথে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কোনো পোস্টার বা ফেস্টুন না টানিয়ে তিনি হেঁটে হেঁটে ভোটারদের ঘরে যাচ্ছেন। বীজযুক্ত কাগজে ছাপানো পরিবেশবান্ধব প্রচারপত্র বিলাচ্ছেন।

তরুণ এই প্রার্থী বলেন, মানুষ তাঁকে প্রশ্ন করছে—এত দিন পরে কেন এলেন? কোথায় ছিলেন? তাঁর মতে, মানুষের এই প্রশ্নই প্রমাণ করে যে ভোটাররা বিকল্প খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, পরিবর্তনের বিষয়ে মানুষকে ভাবাতে পারাই তাঁর কাছে প্রথম বিজয়।

হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইসমাইল হোসেনের ব্যানার–ফেস্টুনও কিছু এলাকায় সীমিত আকারে দেখা গেছে। আর বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন দাবি করেছেন, এই আসনে তাঁদের দলের একটি আলাদা ভোটব্যাংক রয়েছে এবং তিনি সম্মানজনক ভোট পাবেন বলে আশাবাদী।

এই আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। দক্ষিণখানের বাসিন্দা আশরাফ হোসেন বলেন, বেশির ভাগ প্রার্থীই এলাকায় থাকেন না। কেউ কেউ এলাকার রাস্তাঘাটও ঠিকমতো চেনেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তবে তিনি জানান, এসবের মধ্যেও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করবেন।

ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচনী চিত্র দেখাচ্ছে, প্রচারণার জোর, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কোথাও ধোঁকা, কোথাও সীমাবদ্ধতা, আবার কোথাও নতুন পথের খোঁজ—সব মিলিয়ে এই আসনের নির্বাচন কেবল প্রতীক বা ব্যানারের লড়াই নয়; এটি বিশ্বাস, উপস্থিতি ও প্রত্যাশারও এক কঠিন পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত