নাইজেরিয়ায় সশস্ত্র হামলায় নিহত ১৬০ ছাড়াল, শোক ও আতঙ্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৯ বার
নাইজেরিয়ায় সশস্ত্র হামলায় নিহত ১৬০ ছাড়াল, শোক ও আতঙ্ক

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়া আবারও রক্তাক্ত সহিংসতার সাক্ষী হলো। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কোয়ারা অঙ্গরাজ্যের দুটি গ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর নৃশংস হামলায় অন্তত ১৬২ জন নিহত হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, চলতি বছরে এটি নাইজেরিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী সশস্ত্র হামলা। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ এবং আহতদের অনেকে গুরুতর অবস্থায় রয়েছেন।

মঙ্গলবার কোয়ারা অঙ্গরাজ্যের ওরো ও নুকু গ্রামে এই হামলা চালানো হয়। হামলার পরদিন বুধবার বিকেল পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬২ জনে। সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ওমর বায়ো এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং আশপাশের বনাঞ্চল ও ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকা মানুষদের খোঁজে তল্লাশি চলছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র বন্দুকধারীরা হঠাৎ করেই গ্রাম দুটিতে হামলা চালায়। কাইয়ামা অঞ্চলের রাজনীতিক সাইদু বাবা আহমেদ রয়টার্সকে জানান, হামলাকারীরা গ্রামবাসীদের জড়ো করে তাদের হাত পেছনে বেঁধে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। একই সঙ্গে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও ফসলের গুদামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যেই জনবসতিপূর্ণ গ্রাম দুটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়।

তিনি আরও বলেন, “আমি এই মুহূর্তে সেনা সদস্যদের সঙ্গে গ্রামেই অবস্থান করছি। একদিকে মৃতদেহ শনাক্ত করা হচ্ছে, অন্যদিকে এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।” তাঁর মতে, এই হামলা শুধু প্রাণহানির দিক থেকেই নয়, বরং এর নৃশংসতা ও পরিকল্পিত চরিত্রের কারণেও দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, হামলার সময় বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আশপাশের জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে পালিয়ে যায়। এখনো গোত্রের রাজাসহ বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। অনেকে আশঙ্কা করছেন, নিখোঁজদের একটি অংশ হয়তো নিহতদের মধ্যেই রয়েছেন, যাদের মৃতদেহ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

হামলার পেছনে ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘লাকুরাওয়া’ জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ওমর বায়ো বার্তা সংস্থা এপিকে জানান, যদিও এখনো কোনো গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে হামলার ধরন ও পূর্ববর্তী হুমকির ধরন বিবেচনায় লাকুরাওয়ার সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা জোরালো।

স্থানীয় বাসিন্দারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলাকারীরা ছিল জিহাদি মতাদর্শে বিশ্বাসী। তারা আগেও নিয়মিত গ্রামে এসে ধর্মীয় বয়ান দিত এবং স্থানীয়দের নাইজেরিয়ান রাষ্ট্রের আনুগত্য ত্যাগ করে শরিয়া আইন গ্রহণের আহ্বান জানাত। মঙ্গলবার এক ধর্মীয় সমাবেশ চলাকালে গ্রামবাসীরা তাদের এই আহ্বানের বিরোধিতা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই বিরোধিতার পরপরই বন্দুকধারীরা গুলি চালাতে শুরু করে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, গত পাঁচ মাস ধরে হামলাকারীরা গ্রামবাসীদের কাছে হুমকিমূলক চিঠি পাঠিয়ে আসছিল। ওই চিঠিতে তাদের আদর্শ না মানলে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। সংস্থাটি এই হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

কোয়ারা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর আবদুলরহমান আবদুলরাজ্জাক এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি একে ‘চলমান সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে হতাশ সন্ত্রাসী চক্রের কাপুরুষোচিত প্রতিক্রিয়া’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরকার এই হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবে।

কোয়ারা অঙ্গরাজ্য নাইজার অঙ্গরাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। নাইজেরিয়ান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০২৩ সালে প্রতিবেশী নাইজারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে লাকুরাওয়া গোষ্ঠী সীমান্ত এলাকায় আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সীমান্তের দুর্বল নজরদারি ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান সন্ত্রাসীদের চলাচল সহজ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

এদিকে একই দিনে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কাতসিনা অঙ্গরাজ্যের ফাসকারি এলাকার ডোমা গ্রামেও বন্দুকধারীদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়। পুলিশ বুধবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ায় একটি নির্মাণাধীন স্থাপনা ও একটি সেনাঘাঁটিতে পৃথক হামলায় অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছিল। এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা একযোগে বেড়ে চলেছে।

সাম্প্রতিক এই রক্তপাতের প্রেক্ষাপটে নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিতে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ হচ্ছে বলে অভিযোগ তুললেও নাইজেরিয়ান সরকার ও স্বাধীন বিশ্লেষকেরা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে, সহিংসতায় খ্রিস্টান ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ই নির্বিচারে প্রাণ হারাচ্ছে এবং সমস্যাটি মূলত সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুক্ত।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ডের প্রধান জেনারেল ড্যাগভিন অ্যান্ডারসন মঙ্গলবার জানান, নাইজেরিয়ায় একটি ছোট মার্কিন সামরিক দল মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন ও আবুজা।

সব মিলিয়ে, কোয়ারা অঙ্গরাজ্যের এই ভয়াবহ হামলা নাইজেরিয়ার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের জীবনে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও শোক নেমে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, ক্রমবর্ধমান এই সহিংসতা ঠেকাতে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কত দ্রুত ও কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে। নাইজেরিয়ার জনগণের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং সহিংসতার এই দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত