প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একটি নৌযান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হামলা নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, অভিযানে নিহত দুই ব্যক্তি ‘মাদক সন্ত্রাসী’। তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করেনি মার্কিন সামরিক বাহিনী। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে আসা এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক তৎপরতা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা ইউএস সাউদার্ন কমান্ড বা সাউথকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একটি সন্দেহভাজন নৌযানকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। সাউথকমের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌযানটি মাদকপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং নিহত দুই ব্যক্তি ছিল মাদক চক্রের সদস্য। তবে ঘটনার বিস্তারিত, নিহতদের পরিচয় কিংবা নৌযানটিতে কী ধরনের মাদক বহন করা হচ্ছিল—এসব বিষয়ে তারা কোনো প্রামাণ্য তথ্য বা প্রমাণ হাজির করেনি।
এই অনিশ্চয়তা ও তথ্যের ঘাটতিই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রাণঘাতী সামরিক হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে। বিশেষ করে, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না এবং অভিযানের পর স্বচ্ছ তদন্তের ব্যবস্থাও রাখা হয় না।
প্রসঙ্গত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নতুন কিছু নয়। ওয়াচডগ গ্রুপ এয়ারওয়ারসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৪টি সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব অভিযানে কমপক্ষে ১২৬ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এয়ারওয়ারস বলছে, নিহতদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কতজন মাদকপাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার সুযোগ খুবই সীমিত।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এয়ারওয়ারসের রেকর্ড অনুসারে সাম্প্রতিক এই হামলাটি ২০২৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত প্রথম সামরিক আক্রমণ। ফলে এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং নতুন প্রশাসনের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন পূর্বেও ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’-এর নামে কঠোর সামরিক অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছে, যা লাতিন আমেরিকার বহু দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছিল।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আত্মরক্ষার সরাসরি ও আসন্ন হুমকি ছাড়া এ ধরনের হামলা বৈধতা পায় না। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে আত্মরক্ষার তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা ছিল কি না, সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এসব অভিযানের ফলে নিরীহ জেলে, নাবিক কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিহতদের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণের আগেই তাদের ‘মাদক সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যা নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের জন্য গভীর মানবিক সংকট তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মাদকপাচার দমনের নামে সামরিক কৌশলকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। কিন্তু এই কৌশল বাস্তবে মাদক ব্যবসা কমানোর পরিবর্তে সহিংসতা বাড়িয়েছে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতাকে আরও তীব্র করেছে। কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সামরিক অভিযান প্রায়ই মাদক চক্রকে ভেঙে না দিয়ে আরও গোপন ও সহিংস করে তোলে।
সাম্প্রতিক হামলার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠছে—এই অভিযানে কি সত্যিই মাদকপাচার রোধ হয়েছে, নাকি এটি কেবল শক্তি প্রদর্শনের আরেকটি উদাহরণ? আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাউথকম নিহতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেও স্বাধীন কোনো তদন্ত বা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়নি।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো জাতিসংঘকে বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় সংঘটিত এসব হামলার একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি, যাতে নিহতদের পরিচয়, অভিযানের আইনগত বৈধতা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধের উপায় নির্ধারণ করা যায়।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কূটনীতিক মহলেও বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একতরফা সামরিক পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আন্তর্জাতিক আইন বারবার উপেক্ষিত হয়, তবে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সব মিলিয়ে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে নৌযানে চালানো এই সাম্প্রতিক হামলা শুধু দুইজনের মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিকে ঘিরে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশের কাছ থেকে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রত্যাশা করছে বিশ্ববাসী।