আবার বন্দি বিনিময়ে ফিরল আলোচনার আভাস, তবু থামেনি যুদ্ধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
আবার বন্দি বিনিময়ে ফিরল আলোচনার আভাস, তবু থামেনি যুদ্ধ

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাঝে আবারও বন্দি বিনিময়ের পথে হাঁটল রাশিয়া ও ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে টানা দুই দিনের শান্তি আলোচনার পর উভয় দেশ সমান সংখ্যক যুদ্ধবন্দি মুক্তি দিয়েছে। চার মাস পর প্রথমবারের মতো এই বন্দি বিনিময়কে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক স্বস্তির একটি ক্ষণিক আলো হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে দিচ্ছেন—এই অগ্রগতি এখনো স্থায়ী শান্তির কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।

বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রাশিয়া ইউক্রেনের ১৫৭ জন সেনা ও সামরিক কর্মীকে মুক্তি দিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেনও সমান সংখ্যক, অর্থাৎ ১৫৭ জন রুশ সেনাকে রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছে। যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বহুবার বন্দি বিনিময় হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে এই বিনিময় নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। আলোচনার মূল এজেন্ডায় ছিল ইউক্রেনের কিছু ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতে দেশটির নিরাপত্তা সুরক্ষার নিশ্চয়তা। তবে আলোচনা শেষে কোনো পক্ষই বড় ধরনের অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করেনি। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মতপার্থক্য এতটাই গভীর যে আলোচনাকে ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিতে আরও সময় লাগবে।

বন্দি বিনিময়ের খবর ইউক্রেন ও রাশিয়া—উভয় দেশেই আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। মুক্তি পাওয়া সেনাদের পরিবারগুলো দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর স্বজনদের ফিরে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের স্বাগত জানাতে জড়ো হন স্বজন ও সাধারণ মানুষ। অনেকের চোখে ছিল আনন্দের অশ্রু, আবার কারও চোখে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন আর দীর্ঘ বিচ্ছেদের যন্ত্রণা।

তবে মানবিক এই মুহূর্তের মাঝেও যুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতা বদলায়নি। বন্দি বিনিময়ের দিনই রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করেছে বলে অভিযোগ করেছে কিয়েভ। শীতের মৌসুমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আঘাত সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মানবিক সংকট গভীর হচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ জানিয়েছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের ভেতরে ড্রোন হামলার জন্য যে স্টারলিংক টার্মিনাল ব্যবহার করছিল, সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, এই পদক্ষেপ সামরিক দিক থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। যদিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান নতুন করে সামনে এনেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এক বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনের নিহত সেনার সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান ইউক্রেনীয় সমাজে যুদ্ধের গভীর ক্ষতের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বন্দি বিনিময় যুদ্ধবিরতির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্যোগ হলেও তা রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। অতীতেও দেখা গেছে, বন্দি বিনিময়ের পরপরই উভয় পক্ষ আবারও তীব্র সামরিক অভিযান চালিয়েছে। ফলে এই বিনিময়কে অনেকেই ‘মানবিক বিরতি’ হিসেবে দেখছেন, পূর্ণাঙ্গ শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা চলছে। আবুধাবির আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওয়াশিংটনের উপস্থিতি দেখাচ্ছে যে, ইউক্রেন সংকটে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সক্রিয় কূটনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে চায়। তবে একই সঙ্গে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখায় রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব আরও বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে স্থায়ী শান্তির পথে প্রধান বাধা হলো ভূখণ্ডের প্রশ্ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। রাশিয়া দখলকৃত অঞ্চল ছাড়তে অনাগ্রহী, অন্যদিকে ইউক্রেন সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি নয়। এই অবস্থায় বন্দি বিনিময়ের মতো মানবিক উদ্যোগ আলোচনার দরজা খোলা রাখলেও মূল সংকটের সমাধান দিচ্ছে না।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে শান্তিকামী মানুষ ও কূটনীতিকরা এই বন্দি বিনিময়কে স্বাগত জানালেও একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রতিটি বিনিময়, প্রতিটি মুক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ ও সৈনিকরা, যারা রাজনীতির সিদ্ধান্তের ভার বহন করছে জীবন দিয়ে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের সর্বশেষ বন্দি বিনিময় যুদ্ধের অন্ধকারে একটি ক্ষণিক মানবিক আলো জ্বালালেও সংঘাতের অবসান এখনো দূরের পথ। কূটনৈতিক আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা না গেলে এই আলো দ্রুতই নিভে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত