প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে এমন এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত স্টিলথ যুদ্ধবিমান ‘কান’ নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্যের প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বুধবার মিসরের রাজধানী কায়রো সফর শেষে দেশে ফেরার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এরদোয়ান বলেন, প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্ক ও সৌদি আরব তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে আগ্রহী। তিনি জানান, তুরস্কের তৈরি স্টিলথ যুদ্ধবিমান ‘কান’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা সামনে এসেছে।
এরদোয়ান বলেন, ‘কান সম্পর্কে আমরা অনেক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে এবং আমরা যেকোনো সময় এই অংশীদারিত্ব বাস্তবায়ন করতে পারি।’ তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তুরস্ক শুধু যুদ্ধবিমানটি রপ্তানির দিকেই নজর দিচ্ছে না, বরং উন্নয়ন, উৎপাদন ও প্রযুক্তি ভাগাভাগির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায়।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। ড্রোন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশটি ক্রমেই স্বনির্ভর হয়ে উঠছে। ‘কান’ যুদ্ধবিমান প্রকল্পকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান হিসেবে নকশা করা হয়েছে, যা আকাশযুদ্ধে আধুনিক সেন্সর, রাডার এভয়ডেন্স প্রযুক্তি এবং উচ্চ গতির সক্ষমতা নিয়ে কাজ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ হলে এই প্রকল্প শুধু তুরস্কের নয়, পুরো অঞ্চলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই তার সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে স্থানীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের দিকে ঝুঁকছে। তুরস্কের সঙ্গে অংশীদারিত্ব সৌদি আরবের এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
এরদোয়ান তার বক্তব্যে আরও জানান, আংকারা ও রিয়াদের মধ্যে ইতোমধ্যে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের জন্য তুরস্ক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যদিও নির্দিষ্ট কোনো চুক্তির বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি, তবে তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
এক সময় তুরস্ক ও সৌদি আরবের সম্পর্ক নানা কারণে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারিত্ব এই সম্পর্ককে নতুন ভিত্তি দিতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে এই ধরনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কথা বলতে গিয়ে এরদোয়ান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সংলাপের মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত। তার ভাষায়, ‘আলোচনার টেবিল গঠন করাই একমাত্র টেকসই পথ।’ এরদোয়ানের এই বক্তব্য তুরস্কের কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে, যেখানে তিনি সংঘাতের বদলে সংলাপ ও রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন।
গাজা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, গাজায় শান্তি পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে এবং সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তুরস্ক সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। গাজা সংকট নিয়ে এরদোয়ান দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে সোচ্চার এবং মানবিক সহায়তা ও রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। তার সাম্প্রতিক বক্তব্যও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্ক-সৌদি সহযোগিতা কেবল অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং এর কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। একদিকে তুরস্ক নিজেকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অন্যদিকে সৌদি আরব পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস ও নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে আগ্রহী। এই দুই লক্ষ্য একে অপরের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় যৌথ বিনিয়োগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বাড়ছে।
‘কান’ যুদ্ধবিমান প্রকল্প সফল হলে তুরস্ক বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের তালিকায় যুক্ত হবে, যারা নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করতে সক্ষম। সৌদি আরবের মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের বিনিয়োগ এই প্রকল্পের গতি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে এটি দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময় ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এই সম্ভাব্য অংশীদারিত্ব বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক রাজনীতির জটিলতা—সবকিছু বিবেচনায় রেখে এগোতে হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তবুও এরদোয়ানের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তুরস্ক এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে প্রস্তুত এবং সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ব্যাপারে আন্তরিক।
সব মিলিয়ে, ‘কান’ যুদ্ধবিমান ঘিরে তুরস্ক ও সৌদি আরবের যৌথ বিনিয়োগের ইঙ্গিত শুধু একটি প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সম্ভাবনাই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনার আভাস দিচ্ছে। এই উদ্যোগ কত দ্রুত এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে এখন নজর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।